রাত ১২:৩৩ | শনিবার | ৬ জুন, ২০২৬ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩, গ্রীষ্মকাল | ১৯ জিলহজ, ১৪৪৭

নিমতলী ট্র্যাজেডি কি অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড নয়?

মতামত
ইকবাল হাবিব

২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের নগর অগ্নি নিরাপত্তা ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কেমিক্যাল গুদামে আগুন লেগে মুহূর্তেই তা ভয়াবহ রূপ নেয়।

নিমতলী ট্রাজেডি শুধু একটি অগ্নি দুর্ঘটনা ছিল না; এটা ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং দুর্বল তদারকির সম্মিলিত বিস্ফোরণ।

এই ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গুদাম, অননুমোদিত ভবন ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তাহীন স্থাপনা এবং দুর্বল তদারকিকে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়া; আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ মজুদ বা বিপণন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা; ফায়ার সেফটি আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন; ফায়ার হাইড্র্যান্ট স্থাপন; ভবনের জরুরি বহির্গমন নিশ্চিত করা; ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অবকাঠামো, জনবল, প্রশিক্ষণ ও সাজ-সরঞ্জামের আধুনিকায়ন; ৬২,০০০ কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন; অবৈধ গুদামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

রাজধানী থেকে রাসায়নিকের গুদাম-কারখানা সরিয়ে নিতে হয় দুটি কমিটি। সেই কমিটি কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে জায়গা ঠিক করার সুপারিশসহ উচ্চ মাত্রার বিপজ্জনক ৫ শতাধিক রাসায়নিকের তালিকা করে প্রতিবেদন দেওয়া হয় শিল্প মন্ত্রণালয়ে। দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব সুপারিশের বড় অংশই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে, সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার অবহেলা, রাজনৈতিক পোষ্যদের আনুকূল্যে এবং অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ভূমির মালিকগণ আবারও বিপদজনক রাসায়নিক গুদাম-কারখানা ভাড়া দেওয়া শুরু করেন, যে কারণে পুরান ঢাকার বহু এলাকায় এখনো ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক মজুদ, অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং অগ্নিনিরাপত্তাহীন বাণিজ্যিক ব্যবহার বিদ্যমান।

এক্ষেত্রে তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন রাজউক, বৈদ্যুতিক সংযোগ প্রদানকারী সংস্থা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ যেন নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।

নিমতলী ট্রাজেডি শুধু একটি অগ্নি দুর্ঘটনা ছিল না; এটা ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং দুর্বল তদারকির সম্মিলিত বিস্ফোরণ।

ফলে নিমতলীর শিক্ষা কাঠামোগত পরিবর্তনে রূপ নিতে পারেনি। এই সতর্কবার্তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে। নিমতলীর মতোই সেখানে রাসায়নিক গুদাম ও দাহ্য পদার্থের কারণে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনে বহু মানুষ নিহত হন।

পরবর্তীতে মগবাজার বিস্ফোরণ, বনানীর এফআর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ড, বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ড এবং বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডও একই ধরনের অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত, শোক, প্রতিশ্রুতি এবং কিছু সময়ের জন্য অভিযান দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন খুব কমই হয়েছে।

এসব দুর্ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা, দুর্বল সমন্বয় এবং আইনের শিথিল প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে অননুমোদিত ভবন, বাণিজ্যিক রূপান্তর এবং কেমিক্যাল গুদাম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অবগত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতিটি ঘটনার পরই তদন্ত হয়েছে, নির্দেশনা এসেছে, অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে গেছে।

অদ্যাবধি কাউকে অথবা কোনো সংস্থাকে দায়ী করে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, ফলে স্বভাবতই গড়ে ওঠা দায়হীনতার সংস্কৃতি পুরো বিষয়কে আরও জটিল ও ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ যেন এক ভয়ংকর চক্র-অগ্নি অভিঘাত, মৃত্যু, শোক, প্রতিশ্রুতি, তারপর বিস্মৃতি। বিভিন্ন নাগরিক সংস্থা, তদন্ত এবং টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে এসব অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার চাক্ষুষ প্রত্যক্ষদর্শী আমি।

পরিবেশ কর্মীদের তৎপরতার কারণে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নিমতলীর পর থেকেই পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প কার্যক্রম অপসারণের দাবিকে নাগরিক আন্দোলনে রূপান্তরের মাধ্যমে এ সম্পর্কিত জন দাবিকে সামনে নিয়ে আসে।

নিমতলী থেকে চুড়িহাট্টা, মগবাজার ও বেইলি রোড পর্যন্ত প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর পরই বাপা’র অংশগ্রহণই ছিল মূলত অনুসন্ধান পূর্বক প্রতিকারের কাঠামোগত ও আইনগত উপস্থাপন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে দায়ীদের চিহ্নিতকরণ, নীতিগত উত্তরণের লক্ষ্যে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিতে জনসচেতন কার্যক্রম পরিচালন তথা নিরাপদ ও পরিবেশ বান্ধব নগরায়ন নিশ্চিতের আন্দোলন গড়ে তোলা।

অগ্নি অভিঘাত মোকাবিলায় প্রয়োজন অগ্নি নির্বাপণ সংস্থার আধুনিকায়ন ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত জনবল, বিশেষায়িত কেমিক্যাল ফায়ার ইউনিট, সংকীর্ণ এলাকায় কার্যকর উদ্ধার সক্ষমতা সমৃদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

একইসাথে নগরভিত্তিক জরুরি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পুরান ঢাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় ফায়ার হাইড্র্যান্ট নেটওয়ার্ক, জরুরি প্রবেশপথ এবং নিরাপদ সড়কব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অগ্নিনিরাপত্তা আইন, বিল্ডিং কোড, পরিবেশ আইন এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গুদাম, অননুমোদিত রেস্তোরাঁ, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ভবনের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন না থাকা মূলত আইন না থাকারই সমতুল্য!

পাশাপাশি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন জরিপ, সমীক্ষা ও কারিগরি যথাযথকরণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্নিঝুঁকিসহ অন্যান্য অভিঘাত সহনশীল ও বসবাসযোগ্য নগর ও নগরায়ন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। নগরীতে অগ্নিসহ অন্যান্য অভিঘাতের ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় ‘অতি বিপজ্জনক’ ও ‘বিপজ্জনক’ ভবনসমূহ চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি এর তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট ভবনসমূহের সম্মুখে দৃশ্যমানভাবে ‘চিহ্নিতকরণের’ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

এর ফলে ভবন সম্ভাব্য ভবন ব্যবহারকারী সরকারিভাবে বসবাসযোগ্যতার নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পাবে। তাই এই অধিকারটুকু নিশ্চিতকরণে, বিদ্যমান অবৈধ/অননুমোদিত/অনুমোদিত কিন্তু ব্যত্যয়কারী ভবনকে ড্যাপে অনুসৃত বিধান অনুযায়ী গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রাজউক ও পেশাজীবীদের সংগঠনসমূহের সহায়তায় প্রণীত ‘ঢাকা মহানগর এলাকায় অনুমোদনহীন/ইমারতের বিচ্যুতি/ব্যত্যয় সংক্রান্ত ইমারত-এর ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ দ্রুততম সময়ে অনুমোদন ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

…মগবাজার বিস্ফোরণ, বনানীর এফআর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ড, বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ড এবং বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডও একই ধরনের অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত, শোক, প্রতিশ্রুতি এবং কিছু সময়ের জন্য অভিযান দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন খুব কমই হয়েছে।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংস্থা হিসেবে সিটি কর্পোরেশনগুলোর নেতৃত্বে অন্যান্য অংশীজনের মাধ্যমে ভবনের ‘ফি বছর নবায়নযোগ্য ব্যবহারযোগ্যতা’র সনদ ভবন সমূহের প্রবেশ অঞ্চলে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও আশু কাম্য। অগ্নিদুর্যোগ মুক্ত নগরায়ন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ়তা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ অতীতে বহু দুর্যোগ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অগ্নি অভিঘাত রোধের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সম্ভব। নগর নিরাপত্তাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে নিরাপদ নগর গঠনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর জবাবদিহিতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ।

রানা প্লাজার ঘটনার পর যেভাবে দেশের পোশাক শিল্প খাত এবং কারখানাগুলো আমূল পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে, সেভাবে বিদেশি ক্রেতাদের স্বার্থে গড়া অ্যাকর্ড আর অ্যালায়েন্স-এর মতো করে সংগঠনের তত্ত্বাবধানে পুরো সূচিশিল্পব্যাপী উদ্যোগ গ্রহণ করে তিন বছরেরও কম সময়ে অগ্নি নিরাপত্তাজনিত বিপদজনক পরিস্থিতির উন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের যে সাফল্যগাঁথা এদেশেরই অর্জন।

সেই একই দেশে কর্মমুখী জনগণের তথা শ্রমিকের জীবন রক্ষার্থে ‘প্রায় অদৃষ্টবাদিতার উছিলায়’ মেনে নেওয়া ফি বছর জুড়ে চলমান ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’-এর ধারা বন্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

সোজা কথা হলো এই যে, যদি জনগণের নির্বাচিত সরকার হয়েই থাকে, তবে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও দুর্যোগ সহনশীল নগরায়ন নিশ্চিতে যথাযথ ও সমন্বিত কার্যকরী পদক্ষেপ নিতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

নিমতলী, চকবাজার, বনানী, বঙ্গবাজার কিংবা বেইলি রোড—এসব কেবল দুর্ঘটনার নাম নয়; এগুলো আমাদের নগর-ব্যবস্থাপনার অসম্পূর্ণতা, শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অবহেলার নির্মম স্মারক। যদি আমরা অগ্নি নিরাপত্তাকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে হয়তো একদিন ঢাকা এমন একটি নগরীতে পরিণত হবে যেখানে মানুষের জীবন আর অবহেলার আগুনে পুড়ে যাবে না।

 

 

লেখক : স্থপতি ও পরিবেশ কর্মী

জা ই / এনজি