আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে আরও একটি পণ্যবাহী জাহাজে আঘাত হানার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার মার্কিন শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘‘আজ অথবা আগামীকালকের’’ মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার চুক্তিটি সম্পাদিত হতে পারে বলে ওয়াশিংটন আশাবাদী।
সোমবার হোয়াইট হাউসে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বরাবরের মতোই একদিকে যেমন কূটনীতি নিয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন, অন্যদিকে তেমনি কঠোর হুমকিও উচ্চারণ করেছেন। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ধ্বংসাত্মক হামলা বা শিরশ্ছেদের মুখোমুখি হওয়ার আগে ইরানের জন্য এটিই শেষ সুযোগ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আকস্মিক হামলা চালানোর পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক মাসে যুদ্ধবিরতি ও প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি হলেও স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট এই হরমুজ প্রণালিই বারবার সংঘাত বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং যাতায়াতকারী জাহাজগুলো থেকে টোল বা রাজস্ব আদায় করতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা করছে।
গত সপ্তাহে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে অত্যন্ত কঠিন হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু গত শনিবার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে তিনি বলেন, চুক্তির সীমানা ও রূপরেখা নির্ধারিত হয়ে গেছে।
তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও ধরনের আলোচনা বা দরকষাকষি চলছে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেছেন, আমরা ঠিক এই মুহূর্তেও কথা বলছি।
দুই দেশের মধ্যকার মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার মঙ্গলবার বলেছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য সরাসরি কোনও বৈঠকের পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই।
• খুব জটিল কিছু নয়
ট্রাম্প বলেছেন, এই আলোচনার অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাচ্ছে তা মঙ্গলবারই যেকোনো উপায়ে জানা যাবে। তিনি বলেন, বিষয়টি মোটেও জটিল নয়।
কূটনৈতিক আলোচনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া; যা ট্রাম্পের মতে আগামীকালই সম্ভব। অন্য লক্ষ্যটি হলো ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ। ট্রাম্প বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেহরানকে প্রতারক আখ্যা দেন। ইরান প্রকাশ্যে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করায় ওই মন্তব্য করেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান স্বীকার করুক বা না করুক, তারা গত কয়েক দশক ধরে যে জটিল সংকটের জন্ম দিয়েছে, মূলত আমরা তারই সমাধানের চেষ্টা করছি। ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর পাল্টা অবরুদ্ধ দশার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা না চাইলে ইরানে কিছুই ঢুকতে পারবে না। এবং কোনো চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া সেখানে কিছুই প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
চলমান এই যুদ্ধ পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে এবং ওয়াশিংটনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইরান এখনও ওই অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রেখেছে তেহরান।
ট্রাম্পের মূল নজর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার দিকে। পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও তেহরানের স্পষ্ট বক্তব্য, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
মঙ্গলবার ভোরের দিকে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও বলেছে, ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাহাজে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, তাৎক্ষণিকভাবে জাহাজটির নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং এই ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইরান এখনও প্রণালিতে তাদের অবরোধ বজায় রেখেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে, সব ধরনের জাহাজকে যাতায়াতের আগে তাদের সঙ্গে সমন্বয় এবং পথ হিসেবে ইরানি উপকূল সংলগ্ন রুট ব্যবহার করতে হবে।
তবে ঝুঁকিপূর্ণ এ পথ এড়িয়ে অনেক জাহাজ বিকল্প হিসেবে দক্ষিণের পথ ধরে ওমানের কাছাকাছি নিরাপদ দূরত্ব দিয়ে যাতায়াত করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, নৌ চলাচলের নতুন একটি পথ নিয়ে মাসকাটের সঙ্গে আলোচনা করছে তেহরান। তবে এটি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার আলোচনার অংশ নয়।
সূত্র: এএফপি।
আ ই / এনজি






