রাত ৩:২০ | বৃহস্পতিবার | ২২ অক্টোবর, ২০২৬ | ৬ কার্তিক, ১৪৩৩, হেমন্তকাল | ১০ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮

বিআরটি বাদ, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট সড়ক হচ্ছে ছয় লেন : ৪২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে অবশিষ্ট কাজ ৩ শতাংশ, অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্তে বিতর্ক

বিশেষ প্রতিবেদন

 

মাহমুদুল হাসান

২১ অক্টোবর

 

 

রাজধানীর সঙ্গে গাজীপুরের যোগাযোগ সহজ করতে নেওয়া বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে এর অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীপুর-এয়ারপোর্ট করিডরে বিআরটির জন্য নির্মিত স্টেশন, লেন বিভাজকসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে তিন লেন করে দুই দিকের চলাচলের উপযোগী করা হবে।

তবে প্রকল্পের মাত্র ৩ শতাংশ নির্মাণকাজ বাকি থাকা অবস্থায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে বিপুল সরকারি অর্থের ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ গণপরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটিতে ৪ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বিআরটির জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে।

সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভার বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপস্থাপিত চারটি বিকল্প পর্যালোচনা করে চতুর্থ প্রস্তাবটি অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি কারিগরি দলের মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ বিকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২০২৪ সাল থেকে কার্যত স্থবির হয়ে থাকা প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলীর সই করা সোমবারের এক নির্দেশনায় বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ ছয় লেনের সড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসনের পর প্রকল্পটি সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সড়কটিকে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিদ্যমান দুই লেনের উড়ালসড়কগুলোকে চার লেনে রূপান্তরের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। তবে এ কাজের ব্যয়, সময়সীমা এবং বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।

সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ডুয়েট) কয়েকটি পেশাজীবী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মঙ্গলবার পৃথক বিবৃতিতে তারা সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।

তাদের যুক্তি, তুলনামূলক সীমিত অতিরিক্ত বিনিয়োগে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করে বিআরটি চালু করা সম্ভব। নির্দিষ্ট বাস চলাচলের লেন সাধারণ যানবাহনের জন্য খুলে দিলে ভবিষ্যতে সড়কে যানজট ও বায়ুদূষণ বাড়তে পারে। এতে গণপরিবহনভিত্তিক টেকসই নগর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকল্পটি শেষ করার পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের মতে, অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তাদের হিসাবে, বিআরটি চালু করা গেলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। ফলে প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল না করে কার্যকর করার সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

অন্যদিকে, প্রকল্পটি মূল্যায়নে যুক্ত বুয়েটের কারিগরি দলের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হক সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান অবস্থায় আগের প্রকল্প আবার চালু করার উদ্যোগ ভবিষ্যতের পরিবহন প্রকল্পগুলোর জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারত।

তিনি জানান, প্রকল্পটির বিভিন্ন বিকল্প মূল্যায়নে তথ্য-উপাত্ত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং আগের দুটি কমিটির প্রতিবেদনের ফলাফল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে পেশাদারত্বের ঘাটতি ছিল। অন্য পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হলেও প্রকল্পের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে সেগুলোতে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি মূল্যায়নের ঘাটতি ছিল বলে তিনি মনে করেন।

একই সঙ্গে গাজীপুর ও আশপাশের এলাকার ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর রাজধানীমুখী যাতায়াত সহজ করতে রেলভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক শামসুল হক। তাঁর মতে, যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেন এ অঞ্চলের মানুষের জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে। বিআরটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের পরিবহন সুবিধা দিলেও রেল যোগাযোগ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১২ সালে, বৃহত্তর ঢাকা টেকসই নগর পরিবহন কর্মসূচির আওতায়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ব্যয় ও সময়সীমা চার দফা সংশোধন করা হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৮৬ কোটি টাকায়।

প্রকল্পটির ব্যয় আরও বাড়িয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) তা অনুমোদন করেনি। সে সময় প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

প্রকল্পটির মূল সময়সীমা ছিল ২০১৮ সাল। কিন্তু পরিকল্পনা ও নকশার দুর্বলতা, ক্রয়প্রক্রিয়ায় সমস্যা, বাস্তবায়নকারী তিন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, পরিষেবা লাইন স্থানান্তরের জটিলতা এবং ঠিকাদারদের আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে কাজ বারবার পিছিয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারিও বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করে।

নির্মাণকাজ চলাকালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়েও অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পের উত্তরা অংশে একটি গার্ডার পড়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে থাকা একই পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ নির্মাণপর্বে সড়কে চলাচলকারী মানুষকেও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একনেকের সুপারিশে প্রকল্পটি পর্যালোচনার জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে ওই কমিটির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন বিকল্প বিশ্লেষণ করে বুয়েটের কারিগরি দল।

প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ইতোমধ্যে নির্মিত অংশের কতটুকু ব্যবহার করা যাবে, কতটুকু ভাঙতে হবে এবং নতুন সড়ক নির্মাণে অতিরিক্ত কত অর্থ প্রয়োজন হবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সমাপ্তি, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমঝোতা এবং আইনি জটিলতা নিরসনের বিষয়ও রয়েছে।

একদিকে সরকারের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির প্রকল্পটি বর্তমান অবস্থায় চালু করা ভবিষ্যৎ পরিবহন পরিকল্পনার জন্য উপযুক্ত নয়। অন্যদিকে বিরোধিতাকারীদের বক্তব্য, প্রায় সম্পন্ন একটি গণপরিবহন প্রকল্প বাতিল করে তার অবকাঠামো অপসারণের আগে আর্থিক ও পরিবহনগত সুফল-ক্ষতির তুলনামূলক মূল্যায়ন জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।

গাজীপুর থেকে রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। এ করিডরে যানজট কমানো, যাত্রার সময় হ্রাস এবং নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা দীর্ঘদিনের দাবি। ফলে ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে নতুন ব্যবস্থায় যানবাহনের চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এবং গণপরিবহনের জন্য কী বিকল্প রাখা হবে, তার ওপর।

এখন প্রকল্পটির অবকাঠামো অপসারণ, সড়ক সম্প্রসারণ ও উড়ালসড়ক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ করিডরে কমিউটার ট্রেন বা অন্য কোনো গণপরিবহনব্যবস্থা কীভাবে সম্প্রসারণ করা হবে, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যথায় দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নতুন ব্যয় ও যানজটের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসতে পারে।

 

মা হা / এনজি