দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম শুরু হয়েছে অগ্নিনিরাপত্তার উদ্বেগ সামনে নিয়ে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, দ্বীপের হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রিসোর্টের ৬০ শতাংশই অতি অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। আরও ৩০ শতাংশ স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । অর্থাৎ দ্বীপের পর্যটন আবাসনগুলোর ৯০ শতাংশই কোনো না কোনো মাত্রার অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে, কিন্তু দ্বীপে নেই স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, পানির উৎস, পাম্প ও অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষ করে দ্বীপের অনেক রিসোর্ট কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাতাসের প্রবাহে একটি স্থাপনার আগুন আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার করা এবং শুরু থেকেই রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়ায় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের টুপ টুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হওয়ার পর পর্যটন এলাকাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি জোরদার করেছে ফায়ার সার্ভিস। এর অংশ হিসেবে সেন্টমার্টিনে ১৫ দিনের জন্য সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়েছে। তারা বুধবার (৪ নভেম্বর) থেকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সঙ্গে দ্বীপের বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টের কর্মীদের নিয়ে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনে আড়াই শতাধিক হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ১২০ থেকে ১৫৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ৬০ থেকে ৭৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২০ থেকে ২৬টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পানির উৎস ও নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় ঘাটতি পাওয়া গেছে। আর সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর অবকাঠামো, সিঁড়ি ও প্রশিক্ষিত কর্মীর ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও সেগুলোও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইদ্রিচ বলেন, সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ হোটেল-কটেজে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। কোথাও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পাওয়া গেলেও সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী। নিজস্ব পানির উৎস ও পাম্পের ব্যবস্থাও নেই। এর সঙ্গে সরু ও যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী যোগাযোগব্যবস্থা যুক্ত হওয়ায় আগুন লাগলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো একটি স্থাপনায় আগুন লাগলে বাতাসের কারণে তা আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানির কারণ হতে পারে। তাই পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন থেকেই অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, আপাতত দ্বীপের বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে হোটেল-রিসোর্টের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ, আগুন নেভানোর প্রাথমিক কৌশল এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের সঠিক ব্যবহার হাতে-কলমে শেখানো হয়।
পাশাপাশি আগুন লাগলে আতঙ্কিত না হয়ে কীভাবে দ্রুত ও নিরাপদে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পর্যটন মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় হোটেল ও রিসোর্টের কর্মীদের এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইদ্রিচ বলেন, পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিনে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। এ সময় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় হোটেল ও রিসোর্টের কর্মীদের প্রস্তুত থাকা জরুরি। এ জন্য তাদের আগুন লাগার পর দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের সঠিক ব্যবহার এবং প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখানো হয়েছে।
দ্বীপে স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কটেজমালিক ফজলুল হক বলেন, সেন্টমার্টিনে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই দ্বীপে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য তারা আবেদন করবেন। দ্বীপের অধিকাংশ রিসোর্ট কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি। আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য সবাইকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিদর্শনে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ঘাটতি উঠে এসেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ ও বিদ্যমান সরঞ্জাম সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি যাচাই করতে ফায়ার সার্ভিসের দল পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো প্রতিবেদন হাতে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন পেলে সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনিতে হোটেল-রিসোর্ট-কটেজের লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দ্বীপের জন্য একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। তবে সেন্টমার্টিনের রাস্তা ছোট। এখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যথাযথভাবে চলতে পারবে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
পর্যটক বাড়লেও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
জানা গেছে, দীর্ঘ নয় মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে সেন্টমার্টিন। এতে দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে মৌসুমের শুরুতেই জাহাজ চলাচল নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। এ কারণে নির্ধারিত ১ নভেম্বর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করেনি। পরে প্রয়োজনীয় সব সংস্থার অনুমতি সাপেক্ষে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়।
এবার পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন পর্যটকের সর্বোচ্চ সংখ্যা আগের দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। অর্থাৎ পর্যটকের অনুমোদিত সংখ্যা বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। একই সঙ্গে শুরু থেকেই দ্বীপে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশাবাদী হলেও পরিবেশবিদদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। তাদের আশঙ্কা, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও দ্বীপের সুপেয় পানির উৎস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন ও পরিবেশগত ধারণক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে প্রবালপ্রাচীর, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ পর্যটক পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। পর্যটকদের অসচেতন আচরণে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এত দিন পর্যটক চলাচল সীমিত রাখায় দ্বীপের পরিবেশ কিছুটা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো পরিবেশগত অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো এবং রাত্রিযাপনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা ঠিক হয়নি। এতে দ্বীপের পরিবেশের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী মুনিরা পারভীন রুবা বলেন, সেন্টমার্টিন শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রতিবেশব্যবস্থা। এ দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আগে যেখানে দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকের সুযোগ ছিল, সেখানে তা বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুরু থেকেই রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো সুপেয় পানির ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন ও পরিবেশগত অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত, সেটি আগে নিশ্চিত করা জরুরি।
আ হে / এনজি






