নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তার মৃত্যুতে রাষ্টপ্রতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম), ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সংসদের সরকার দলীয় চিফ হইপ নুরুল ইসলাম মনিসহ মন্ত্রীপরষদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ করেছেন। শোক বার্তায় নেতৃবৃন্দ মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেনা জানান। এদিকে আজ সোমবার দেশব্যাপী একদিনের শোক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।
সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের দ্বিতীয় ও শেষ নামজে জানাযা রোববার বাদ আসর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীরবিক্রম), ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিসহ মন্ত্রী সভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্থাসহ দলীয় নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ, পরিবারের সদস্য, দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন। এ সময় অনেকেই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংসদীয় জীবনের বিভিন্ন দিক স্মরণ করেন। জানাযা পূর্বে তার জীবনী তুলে থুরেন সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। জানাযা শেষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে তার কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
জানাযা পূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে স্পিার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তার মৃত্যুতে সংসদের প্রতিটা সদস্য আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন। তিনি রাজনৈতিক অঙ্গণে একজন সুপরিচিত মানুষ ছিলেন।
সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা একজন প্রিয় মানুষকে বিদায় জানাতে সবাই সমবেত হয়েছি, যার বিরুদ্ধে কেউ কোনো দিন কোনো অভিযোগ করেছেন বলে জানা নেই। পেশাগত জীবনে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাক্ষর রেখেছেন। সুনাম এবং বিশ্বস্ততার সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন সফল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি আপত দৃষ্টিতে একজন সফল মানুষ ছিলেন। আমরা মহান রবের কাছে আবেদন জানাই, তিনি যেন পরকালেও সফলতা লাভ করেন। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যারিস্টার জমির একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। একইসাথে তিনি দক্ষতা ও সুনামের সাথে সংসদ পরিচালনা করেছেন। তিনি একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। তার মৃত্যুতে দল হিসেবে আমরা খুবই শোকাহত।
সরকার দলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ব্যারিস্টার জমির একাধিকবার সংসদ সদস্য সদস্য নির্বাচত হয়েছিলেন। তিনি সবার কাছেই একজন জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন।
পিতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে বক্তব্য রাখেন মরহুমের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির এমপি। তিনি সবার কাছে তার পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে বলেন, দীর্ঘদিন আমার আমার বাবা আপনাদের সাথে কাজ করেছেন। কারো সাথে কোনো আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকলে সবাই উনাকে মাফ করে দিনবন। তিনি বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সাবেক এই স্পিকারের লাশ তার গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সংসদ প্রাঙ্গণের আগে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে বাদ জোহর মরহুমের প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
রোববার ভোরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। মৃত্যুকালে প্রবীণ এই রাজনীতিকের বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তিনি এক কন্যা, দুই ছেলেসহ অসংখ্য গ্রণগাহী রেখে গেছেন। তার বড় ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বর্তমান সংসদে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। অনেকে মরহুমের ধানমন্ডির বাসায় শোক জানাতে আসেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত ও বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশকিছু দিন ধরে তিনি বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। এছাড়া অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে সংসদের স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেতুঁলিয়ার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক সন্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি এলএলবি পাশ করে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার এট ল সনদ লাভ করে। শিক্ষাজীবন শেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট থেকে সনদ নিয়ে ১৯৬০ সালের ২৭ মে আইন পেশায় যোগ দেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সংবিধান, দেওয়ানী ও ফোজদারী আইন বিশেষজ্ঞ।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছাত্র জীবনে বাম সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৫ সালে তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু । পরে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপ ভাসানীর সাথে যুক্ত ছিলেন।
আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সহচর ছিলেন। ব্যারিস্টার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথমে যে জাতীয় গণতান্ত্রিক দল(জাগদল) গঠন করেছিলেন তাতেও তিনি ছিলেন। পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠা হলে এর স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। আইনপেশায় খ্যাতিমান হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পাঁচবার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান।






