রাত ৯:১৭ | বুধবার | ১০ জুন, ২০২৬ | ২৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩, গ্রীষ্মকাল | ২৩ জিলহজ, ১৪৪৭

বিশ্বকাপ ট্রফি ধরে রাখতে কতটা প্রস্তুত আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপের জন্য জয়ে প্রস্তুতি শেষ করল আর্জেন্টিনা

লম্বা সময় হতাশার পর সাফল্যের পথে আর্জেন্টিনার যাত্রাটা শুরু হয় ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা দিয়ে। ব্রাজিলকে ১–০ গোলে হারিয়ে সেবার দক্ষিণ আমেরিকান শ্রেষ্ঠত্বের দখল নেয় আর্জেন্টিনা। এরপর ‘ফিনালিসিমা’ ম্যাচে ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে আরেকটি আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেন মেসি। তবে মেসির মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপ শিরোপা।

বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করলেও আর্জেন্টিনা কিন্তু সেখানেই থেমে যায়নি। বিশ্বকাপের পরের সময়টাতেও আর্জেন্টিনার জয়ের ক্ষুধা একটুও কমেনি। যার প্রমাণ ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় দলটির পারফরম্যান্স।

দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফুটবল খেলেছে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের মতো দলকে দুই লেগেই হারিয়েছে। সব মিলিয়ে ১৮ ম্যাচে ১২ জয় ২ ড্র ও চার হারে ৩৮ পয়েন্ট নিয়ে সবার ওপর ছিল তারা, যা দুইয়ে থাকা ইকুয়েডরের চেয়ে ৯ পয়েন্ট বেশি। পুরো বাছাইপর্বে জুড়ে বাকিদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় তারা।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মতো কোপা আমেরিকার পারফরম্যান্সেও আর্জেন্টিনার ছিল দুর্দান্ত। গ্রুপপর্বে তিন ম্যাচে তিনটিতেই জেতা আর্জেন্টিনাকে এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও শেষ পর্যন্ত থামানো যায়নি।

ইকুয়েডরকে টাইব্রেকারে ৪–২ গোলে হারিয়েই সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। এরপর সেমিফাইনালে কানাডাকে হারায় ২–০ গোলে এবং ফাইনালে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা কলম্বিয়াকে হারায় ১–০ গোলে। অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েই কোপা মিশন সম্পন্ন করে দলটি।

আর্জেন্টিনার ভরসা সেই মেসিই

বাছাইপর্ব ও কোপা আমেরিকার পারফরম্যান্স বলে দিচ্ছে, বিশ্বকাপের সাফল্য আর্জেন্টিনার ওপর চেপে বসেনি। এখনো মাঠে নামলে আগের মতো জয়ে মরিয়া থাকতে দেখা যায় মেসি–এনজো–মার্তিনেজদের। সেই মরিয়া মনোভাব ও হার না মানার মানসিকতাই মূলত সাফল্য এনে দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। এই মানসিকতা এখন বিশ্বকাপেও দেখার অপেক্ষা।

আর্জেন্টিনার সাফল্যের আরেকটি কারণ হতে পারে ট্রফিজয়ী দলের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা। মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টার, রদ্রিগো দি পল, হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা এনজো ফার্নান্দেজরা গতবারের মতো এবারও প্রস্তুত হয়ে বিশ্বকাপ জিততে এসেছেন। তাঁরা জানেন এই মঞ্চ কীভাবে নিজেদের করে নিতে হয়। এটুকু আত্মবিশ্বাস বিশ্বকাপে একটি দলকে সামগ্রিকভাবে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারে।

তবে স্কালোনি যে শুধু অভিজ্ঞতায় ভরসা করছেন তা নয়, দলে তারুণ্যের হাওয়াও লাগিয়েছেন। ভ্যালেন্তিন বারকো, গিওলিয়ানো সিমিওনে, ফাকুন্দো মেদিনা কিংবা নিকো পাজরা দলে নতুনত্ব নিয়ে এসেছেন। অভিজ্ঞদের সঙ্গে তাঁরা গড়ে তুলেছেন অবিশ্বাস্য এক যৌথতা। এই দুই বিপরীতমুখী শক্তির ওপর ভর করেই আর্জেন্টিনা এখন বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে বাজিমাত করতে প্রস্তুত।

স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার এই দল খুবই স্থিতিশীল। লম্বা সময় ধরে দলটিকে তৈরি করেছেন আর্জেন্টাইন এই কোচ। তাঁর অধীনে দলে কোনো বিতর্ক বা টানাপোড়েনের দেখা মেলেনি। মেসির উপস্থিতিও দলের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বকাপ জয়ের পরও দলকে আবেগ ও উদ্‌যাপনে ভেসে যেতে দেননি স্কালোনি। তাঁর দল নির্বাচন, কৌশল বা ম্যাচ ব্যবস্থাপনা নিয়েও এখন পর্যন্ত কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি, যা আরেকটি বিশ্বকাপ মিশনের আগে আর্জেন্টিনাকে নিশ্চিতভাবে বাড়তি শক্তি জোগাচ্ছে।

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি

আর্জেন্টিনা যে প্রস্তুত সে বার্তা দিচ্ছে সর্বশেষ দুটি প্রস্তুতি ম্যাচও। হন্ডুরাসকে ২–০ গোলে হারানোর পর আজ সকালে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় ৩–০ গোলে। এই দুই ম্যাচে স্কালোনি বেশ কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছেন এবং দারুণভাব সফলও হন। তবে সামগ্রিকভাবে বলের দখল, প্রেসিং, সুযোগ তৈরি ও গোল করায় সন্তোষজনক পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে আর্জেন্টিনা। শুধু লাওতারো মার্তিনেজের ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতাটুকুই একটু পোড়াবে স্কালোনিকে।

সর্বশেষ মেসি–ম্যাজিক! ৩৮ বছর পেরিয়ে এখনো আর্জেন্টিনা দলের সেরা খেলোয়াড় মেসি। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি নেমে ১১৯ সেকেন্ডের মধ্যে গোল করেছেন। পেনাল্টি গোল হলেও পুরো সেট–আপটা মেসিরই তৈরি করা ছিল। এরপর থিয়াগো আলমাদার গোলের মঞ্চও তাঁর তৈরি। তবে গোলের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে মেসির উপস্থিতি। তিনি নামতেই যেন পুরো মাঠের আবহ মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। গ্যালারি থেকে মাঠ—সবকিছুতে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। বিশ্বকাপেও মেসি–ফ্যাক্টর গড়ে দিতে পারে বড় পার্থক্য।

বিশ্বকাপ ধরে রাখতে আর্জেন্টিনা দল প্রস্তুত হলেও কিছু দুশ্চিন্তাও আছে। গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের বয়স এবং অতিরিক্ত মেসি–নির্ভরতা বড় ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ভোগাতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের দ্রুতগতিসম্পন্ন দলগুলোর বিপক্ষে। তবে নিজেদের সেরাটা খেলতে পারলে এসব দুশ্চিন্তা আর্জেন্টিনার সামনে থেকে খড়খুটোর মতো উড়ে যাওয়ার কথা।

শা হা / এনজি