বিশেষ প্রতিবেদন
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
০৬ মে ২০২৬

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে কিছু সংস্কার শেষে বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে দেশ পরিচালনা শুরু করেছে। দলটির ‘ভিশন ২০৩০’ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ‘৩১-দফা’র ওপর ভিত্তি করে এই ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছে তারা। প্রথম তিন মাসে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার ও বাজার নিয়ন্ত্রণ, অসহায়দের পাশে দাড়ানোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন চলছে। যদিও বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণ এখনো সম্ভব হয়ে উঠেনি। এরপরই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক অস্থিরতা নিরসেন ও রাজনৈতিক হয়রানির সংস্কৃতি বন্ধ করতে কাজ শুরু করবে দলটি।
জানা গেছে, সরকার গঠনের প্রথম বছরে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য কমাতে সংবিধান সংশোধন করবে। এর প্রধান দিকগুলো হবে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা। কোনো ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, এমন আইন পাস। সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের প্রাজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ত করা। জেলা পরিষদ ও স্থানীয় সরকারকে অধিকতর শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত করা। বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করার উপর জোর দেয়া। এছাড়াও প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন এবং নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুশাসনের সরকার গঠন করার উপর জোর দিবে সরকার।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদুর রহমান বলেন, নতুন সরকার ১৮০ দিনের যে অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, তা নীতিগতভাবে একটি ইতিবাচক এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী উদ্যোগ ছিল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান- এসবই বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রথম দুই মাসে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেছে। তবে সব ক্ষেত্রে যে সফল হয়েছে সেটি বলা যাবে না। আবার এখনই মূল্যায়নের সুযোগ নেই। তবে এই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নই নির্ভর করবে তাদের আগামী দিনের সফলতা।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য দ্বিতীয় বছরটিকে ‘ইমার্জিং ইয়ার’ হিসেবে দেখছে সরকার। খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধে একটি শক্তিশালী ‘ব্যাংক সংস্কার কমিশন’ গঠন করার কথা রয়েছে সরকারের। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া, করের আওতা বাড়ানো কিন্তু করের হার সহনীয় রাখা, এনবিআর-এর ডিজিটালাইজেশন সম্পন্ন করা, প্রতি বছর অন্তত ২০ লক্ষ তরুণকে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাদের জন্য অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার টার্গেট রয়েছে সরকারের। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে শিল্পায়নের উপর গুরুত্বও থাকবে।
জানা গেছে, সরকারের তৃতীয় বছর অবকাঠামো ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করবে বিএনপি। সরকারের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। শুধু সড়ক নয়, রেল ও নদীপথকে যোগাযোগের মূল ভিত্তি হিসেবে রূপান্তর করা, আমদানি নির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে এসে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও বায়ুশক্তি) হার মোট বিদ্যুতের ৩০ শতাংশে উন্নীত করা, সারাদেশে স্মার্ট বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপন করে সিস্টেম লস কমিয়ে আনার উপর জোর দেয়া হবে। চতুর্থ বছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বিপ্লব ঘটানোর টার্গেট রয়েছে সরকারের। রোডম্যাপের চতুর্থ বছরে গুরুত্ব পাবে মানবিক উন্নয়ন সূচক। জিডিপির অন্তত ৪-৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা। গবেষণানির্ভর উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ স্লোগান বাস্তবায়নে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড প্রদান, প্রতিটি বিভাগে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকারিভাবে কোল্ড স্টোরেজ চেইন তৈরির বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি সরকার কীভাবে দেশ চালাতে চায়, সেই বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব নেয়ার পরই বলেছেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অথবা জোর জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। ভঙ্গুর অর্থর্নীতি পুনরুদ্ধার, ভ্যাংক সেক্টারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা, মত স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা, এগুলো সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে থাকবে।
জানা গেছে, সরকারের শেষ বছর হবে আগের চার বছরের অর্জনের মূল্যায়ন ও টেকসই রূপ দান। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং আইসিটি রপ্তানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া, ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এই নীতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কানেক্টিভিটির কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করা থাকবে বিশেষ অগ্রাধিকার। এছাড়াও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ রক্ষায় ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’-এর আওতায় ২৫ কোটি গাছ রোপণ, বিভাগীয় শহরগুলোকে শক্তিশালী করে ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমানো, শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে চামড়া, ওষুধ, আইসিটি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপি সরকারের এই ৫ বছরের রোডম্যাপ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং দুর্নীতির শেকড়। তবে নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতি গঠনের মাধ্যমে দল-মত নির্বিশেষে মেধাবীদের কাজ করার সুযোগ দিলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বারবার যে ‘মেরিটোরিয়াস বাংলাদেশ’ বা মেধাবীদের বাংলাদেশের কথা বলেছেন, তার প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে এই ৫ বছরের রোডম্যাপে। সাধারণ মানুষ আশা করছে, প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি শান্ত ও সমৃদ্ধ আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই রোডম্যাপ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি তাদের ঘোষিত ৩১ দফার অন্তত ৬০-৭০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি হবে অন্যতম সফল শাসনামল। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে কঠোর তদারকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি। জনগণ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তব প্রতিফলন দেখার জন্য। ৫ বছর পর বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করবে এই রোডম্যাপের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ওপর।
যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির দীর্ঘদিনের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক, সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার গঠনের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিতে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আপাতত সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। সামনে সরকারের প্রথঞম বাজেট আছে। সরকার একটি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দেবে বলে আমা করছি। যেগুলো সরকারের পাঁচ বছরের মধ্যেই মোটামুটি বাস্তবায়নযোগ্য।
জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগেড় তাদের যে ইশথেহার দিয়েছিল, সেই অনুযায়ী অগ্রাধিকার দিয়ে প্রত্যেখটি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে। বিশেষ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসনের পাশাপাশি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই হবে প্রধান কাজ। এগুলো সফল হলে অনেক অঙ্গীকারই বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সরকার গঠনের আড়াইমাসের মধ্যে বিএনপি উল্লেখযোগ্য অনেকগুলো কাজ করেছে। যেহেতু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন থেকে শুরু করে সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে, তাই সহসাই সব সমস্যার সমাধান হবে না। পাঁচ বছর পর দেশ একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌছে যাবে বলে আশা করছি। এজন্য সবার সহযোগিতাও প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরী।
জা ই / এনজি





