বিশেষ প্রতিবেদন
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দল ও প্রার্থীদের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। প্রতিশ্রুতির জোয়ার দেখা যাচ্ছে শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে। এর মধ্যে নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর আগেই দলের পক্ষ থেকে অঙ্গিকার সমূহ তুলে ধরে সভা সমাবেশে জানান দিয়েছে বিএনপি। তবে নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিক ইশতেহার প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে দলটি। আগামী বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে ইশতেহার ঘোষণার করার কথা রয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের পক্ষে এই ইশতেহার উপস্থাপন করবেন। জানা গেছে, ঘোষিতব্য ইশতেহারে সভা সমাবেশের অঙ্গিকার যেমন থাকবে তেমনী কিছু অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বাদও যাবে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এবারের ইশতেহার প্রণীত হচ্ছে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ, নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া তারেক রহমানের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে। তবে ইশতেহারে তরুণ, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পাবে। এর পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিকে প্রাধাণ্য দেয়া হবে। নতুন ভোটারদের কাছে টানতে বিশেষ কর্মসূচিও থাকছে ইশতেহারে।
জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়টি সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইশতেহার ঘোষণার জন্য প্রথমে ১ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্য ছিল বিএনপির। তবে দলের চেয়ারম্যানের বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া নানান প্রতিশ্রুতিসহ দু-একটি বিষয় ইশতেহারে শেষ মুহূর্তে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সে কারণে ইশতেহার ঘোষণার তারিখও পিছিয়ে দেওয়া হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হওয়ার কথা থাকলেও বরিশাল সফরের কারণে সেটি ৫ তারিখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ জানানো হয়নি।
জানা গেছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে এনে ইশতেহারের কাজ শেষের দিেিক। এছাড়া আরও কয়েকটি ম্লোগানও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তারেক রহমান চাইলে যে কোনটি ফাইনাল করতে পারবেন। এছাড়া ইশতেহারে কিছু জিনিস তারেক রহমান এখনো নিজের কাছে রেখেছেন। বিশেস করে স্বাস্থ্য সেবা, নারীদের নিয়ে ভাবনা, রাজধানীকে যান চলাচলে বিশেস ব্যবস্থা, এসব বিষয়গুলো নিজের মত করে সাজাবেন। এরপর সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেই চূড়ান্ত হওয়া ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিএনপির মূল প্রতিশ্রুতি মূলত আটটি। সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশবান্ধব নীতিমালা এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাস্তবমুখী এসব কর্মসূচি দলটি এরই মধ্যে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করেছে। ইশতেহারে এগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া সুদসহ কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ভারতের ফারাক্কার বিপরীতে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ অঞ্চলভিত্তিক বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নানা প্রতিশ্রুতিও থাকছে ইশতেহারে।
এছাড়া নির্বাচনী শাসন ব্যবস্থা পুনর্গঠন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ ইশতেহারের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে বিএনপির অঙ্গীকার। বিএনপি নেতারা আশা করছেন, ৩১ দফা, জুলাই সনদ ও টার্গেট গ্রুপভিত্তিক প্রতিশ্রুতি, এ তিনের সমন্বিত ইশতেহার তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন গতি এনে দেবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক-সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে বাস্তবমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি আমরা এরই মধ্যে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করেছি। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে এগুলো গুরুত্ব পাবে। শিগগির এ ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।
সূত্র মতে, সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে বিএনপি। দলটির এ ৩১ দফার মূল বিষয় হিসেবে ইশতেহারে অবাধ নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনাও ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে। দলটির ইশতেহারে কওমি মাদ্রাসা উন্নয়ন, ইসলামিক গবেষণা তহবিল গঠন, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন, ধর্মচর্চার বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন না করার অঙ্গীকার থাকছে। ইশতেহারে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নিরাপত্তা সেল, উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর কার্যক্রম চালুর প্রতিশ্রুতি যুক্ত হবে।
যুবসমাজকে টার্গেট করে বিএনপি বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে ইশতেহারে। এর মধ্যে রয়েছে, সরকারে গেলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি নতুন চাকরি, স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি প্রশিক্ষণ, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার ও মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স। তারেক রহমানের ভাষায়, নতুন বাংলাদেশ গড়বে যুবসমাজ, চাকরির সংকট নয়, দক্ষতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সুযোগ সৃষ্টি করবে বিএনপি। কৃষি ও কৃষককে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার চূড়ান্ত করছে বিএনপি। এর মধ্যে কৃষি উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিঋণ সহজ করা এবং ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকবে।
নারী নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, এগুলোও ইশতেহারের অংশ হচ্ছে। এ ছাড়া ইশতেহারে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিএনপির আট মূল প্রতিশ্রুতি। দলের ঘোষিত এই আট অগ্রাধিকারভিত্তিক সামাজিক নীতির কাঠামো এরই মধ্যে কূটনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের জানিয়েছে বিএনপি। সেখানে দলটি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড কীভাবে এগিয়ে নেবে, তা বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়। গত ২১ জানুয়ারি রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ‘পলিসি ডিসেমিনেশন অন প্রায়োরিটি সোশ্যাল পলিসিজ’ শীর্ষক আলোচনায় এই আটটি খাতের ওপর আলোকপাত করে বিএনপি। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র মতে, গত কয়েকবছর তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থানকালে ভিডিওবার্তা ও ভার্চুয়াল আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের কথা বলেছেন। এ ছাড়া নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের বিভিন্ন পোস্ট এবং দেশব্যাপী চলমান নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া তার বক্তব্যে দলীয় রাষ্ট্রের অবসান, গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা, এসব বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। দলীয় সূত্র বলছে, এসব দিকই ইশতেহারের চূড়ান্ত ভাষায় প্রতিফলিত হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি অথীতেও গণমানুষের আকংখাকে ধারণ করে কাজ করেছে। বিএনপি যে সব াঙ্গিকার করেছে সেগুলো বাস্তবায়ন করেছে। ভবিষ্যতেও দেশবাসীর চাহিদাকে ধারণ করেই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করছে।
২০০৮ সালে কারামুক্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান তারেক রহমান। এরপর প্রায় দেড়যুগ কাটাতে হয় নির্বাসনে। অবশেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফিরেই দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করার কথা তুলে ধরে সেটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চেয়েছেন তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান ফর দ্য পিপল, ফর মাই কান্ট্রি।’ এরপর থেকেই তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এ কি আছে তা জানার আগ্রহ দেখা দিয়েছে দেশবাসীর কাছে। ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এ কি আছে তা তারেক রহমান নিজেই আস্তে আস্তে প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। তবে নির্বাচনী ইশতেহারেই সেটির পূর্ণ বিবরণ উল্লেখ থাকবে বলে মনে করছেন রাজনীতিক বোদ্ধারা।
জা ই / এনজি






