দুপুর ১২:৩০ | সোমবার | ১৭ আগস্ট, ২০২৬ | ২ ভাদ্র, ১৪৩৩, শরৎকাল | ৩ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮

অনবদ্য মেসি, স্কালোনির কার্যকর কৌশল ও নির্লিপ্ত আলজেরিয়া

বিশেষ প্রতিবেদন

‘আমি কখনোই নির্দিষ্ট একজন খেলোয়াড়কে আটকানোর ছক কষি না, আগামীকালও তা করব না। একজন ব্যক্তির জন্য পুরো দলকে প্রস্তুত করা অর্থহীন’, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নামার আগে এমনই অভিব্যক্তি ছিল আলজেরিয়ান কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচের। অনবদ্য পারফরম্যান্সে করা হ্যাটট্রিকে সেই মেসিই তাদের ভরাডুবি (৩-০) এনে দিয়েছে। 

ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায়ও মেসির অনবদ্য পারফরম্যান্স, আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনির কার্যকর কৌশল ও মেসিকে ঠেকানো এবং গোল হওয়ার মতো বড় সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে একেবারে নির্লিপ্ত–প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ছিল আলজেরিয়া। আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া লড়াইয়ে ফল নির্ধারণী বিষয়গুলোর একনজরে আলোকপাত করা যাক–

ফুরিয়ে যাননি মেসি
মেসি রেকর্ড সর্বোচ্চ ষষ্ঠ বিশ্বকাপে নামার আগে কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। তিনি কতটা ফিট থাকবেন? আর্জেন্টিনার একাদশে কি তার জায়গা নিশ্চিত হবে? ৩৯তম জন্মদিনের একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি কি এখনও এই পর্যায়ের ম্যাচে আধিপত্য বিস্তারের মতো শক্তি ও ক্ষুধা ধরে রেখেছেন? এসব প্রশ্ন কতটা অপ্রয়োজনীয় ছিল তা মাত্র ৪৫ মিনিটেই প্রমাণ করে দিলেন মেসি। দীর্ঘদিন পর তাকে এমন ছিপছিপে, তীক্ষ্ণ এবং আগ্রাসী রূপে দেখা গেল।

মাঝমাঠের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে মেসি পুরো আক্রমণের পরিকল্পনাকারী এবং শেষ আঘাতকারী– দুই ভূমিকাতেই ছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধেও মেসির জাদু অব্যাহত ছিল। তার অসাধারণ এক পাস থেকে লাউতারো মার্টিনেজ গোলের সুযোগ পান। এরপর ম্যাচের এক ঘণ্টা পার হওয়ার পর গোলরক্ষকের ভুল কাজে লাগিয়ে মেসি করেন নিজের দ্বিতীয় গোল। এরপর আসে শেষ চমক– বক্সের বাইরে থেকে তার চিরচেনা ভঙ্গিতে নিচু ও জালের কোনায় নিখুঁত শটে গোল।

আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ও স্কালোনির কৌশল
বিশ্বকাপের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এটি আর্জেন্টিনার তৃতীয় আসর, তবে এবারই প্রথম তারা শিরোপাধারী দল হিসেবে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হার এড়াতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৮২ সালে বেলজিয়াম এবং ১৯৯০ আসরে ক্যামেরুনের কাছে আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পরাজয় ছিল এমন একটি ধারার অংশ। কিন্তু আলজেরিয়ার বিপক্ষে স্বস্তির জয় আর্জেন্টিনাকে ইতোমধ্যে নকআউট পর্বের পথে এগিয়ে রেখেছে। সামনে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডান।

ম্যাচজুড়ে রদ্রিগো ডি পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজদের নিয়ে গড়া মিডফিল্ড ছিল বেশ নিখুঁঁত। তাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারেনি আলজেরিয়ার ফুটবলাররা। অ্যালিস্টারের একটি জোরালো শটের সুবাদেই মেসি তার দ্বিতীয় গোলটি পান, যা প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের হাত ফসকে ফিরে আসে। মেসি ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে সেটিকে গোলে পরিণত করেন।

এ ছাড়া স্কালোনি ম্যাচের আগেই বলেছিলেন– আলজেরিয়া ম্যাচটি কঠিন হবে, যথেষ্ট সমীহ দেখান প্রতিপক্ষের প্রতি। এর বাইরে মেসিকে নিয়ে কিংবা তাকে ছাড়া তার বিকল্প পরিকল্পনা আছে বলেও জানা যায়। ম্যাচেও এই মাস্টারমাইন্ডের কার্যকর কৌশল দেখা গেছে।

নড়বড়ে জিদানপুত্র লুকা জিদান
বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করা কখনোই সহজ নয়। যদিও লুকা জিদানের ভূমিকাটা তার বাবা জিনেদিনের জিদানের চেয়ে ভিন্ন। তিনি গোলরক্ষক হওয়ায় ফ্রান্সের কিংবদন্তি জিদানের সঙ্গে তুলনার সুযোগ সীমাবদ্ধ। কিছুদিন আগে চোয়াল ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্বকাপ অভিষেকে লুকা মুখে মাস্ক পরে নামেন। এরপর মাঠে যা হয়েছে তা ২৮ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের জন্য রাতটি ছিল ভুলে যাওয়ার মতো।

মেসির প্রথম গোলের শট বাতাসে কিছুটা বাঁক নেয়, তবে নাগালে থাকা বলটির স্পর্শ পেলেও লুকার মুষ্টিবদ্ধ হাতে জোর ছিল না সেভাবে। দ্বিতীয় গোলটি ছিল নিঃসন্দেহে বড় ভুল। অ্যালিস্টারের শটের গতিতেই দিশেহারা হয়েছেন এবং তা বল তুলে দেন মেসির সামনে। আর তৃতীয় গোলটিতে তার তেমন কিছু করার সুযোগ ছিল না। তবে অভিজ্ঞ ও কিংবদন্তি বাবার সান্নিধ্য হয়তো তাকে এই দিন ভুলে যেতে সাহায্য করবে!

নখদন্তহীন আলজেরিয়া
মেসিকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে চান না বলে জানিয়েছিলেন আলজেরিয়ার বসনিয়ান কোচ। কিন্তু পেতকোভিচ আর্জেন্টিনার দলগত দৌড় থামাতে কী পরিকল্পনা নিয়ে নেমেছিলেন, তাই স্পষ্ট ছিল না। বিশেষত যেকোনো প্রতিপক্ষ দলই যেখানে মেসির মতো তারকাদের কড়া মার্কিংয়ে রাখে, সেই চেষ্টা দেখায়নি আলজেরিয়া। অন্যান্য পজিশনেও প্রতিপক্ষ ফুটবলারদের টেক্কা দেওয়ার মতো কার্যকারিতা ছিল না ফুটবলারদের।

এবার নিজেদের পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলতে নেমে লজ্জার কীর্তি গড়েছে আলজেরিয়া। পুরো ম্যাচে তারা অন-টার্গেটে কোনো শট নিতে পারেনি। যা তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম। এ ছাড়া ১৯৮২ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে হার এড়ানোর পর আলজেরিয়া নিজেদের শেষ তিন বিশ্বকাপ আসরের (২০১০, ২০১৪ ও ২০২৬) উদ্বোধনী ম্যাচে হেরেছে।

 

 

 

জা ই/ এনজি