বিশেষ প্রতিবেদন
মোঃ আল রশিদ
২৩ অক্টোবর ২০২৬
জমি ও স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচায় নিবন্ধন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর সুপারিশ করেছে সরকারের একটি কমিটি। দলিলে জমির প্রকৃত বাজারমূল্য দেখানো নিশ্চিত করা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর ও ফাঁকি কমানো এ উদ্যোগের লক্ষ্য। প্রস্তাব অনুযায়ী, নিবন্ধন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক ও স্থানীয় সরকার করের হার কমানোর পাশাপাশি জমির মূল্য নির্ধারণে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।
সাবেক ভূমিসচিব এ এস এম সালেহ আহমেদের নেতৃত্বাধীন কমিটি সম্প্রতি প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দিয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তরমূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল সংস্কারের রূপরেখা তৈরির জন্য কমিটিটি গঠন করা হয়েছিল।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, জমি নিবন্ধনের ফি বিদ্যমান ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্ট্যাম্প শুল্ক ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ করার সুপারিশ রয়েছে। শহরাঞ্চলে স্থানীয় সরকার কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে এ কর ২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া সব ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর বা সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত অগ্রিম করের হার এক শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মৌজাভিত্তিক জমির মূল্য নির্ধারণের জন্য বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ করে তার ভিত্তিতে নিবন্ধন ফি কমানো হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়তে পারে। এতে একদিকে জমির ক্রেতা-বিক্রেতার ওপর কর ও ফি বাবদ চাপ কমবে, অন্যদিকে দলিলে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করার প্রবণতা বাড়বে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় জমি হস্তান্তরের দলিলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্যের পরিবর্তে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মৌজা মূল্য দেখানো হয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মৌজা মূল্য এবং জমির প্রকৃত বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ফলে জমি কেনাবেচায় প্রকৃত অর্থের পরিমাণ সরকারি নথিতে প্রতিফলিত হয় না।
বর্তমানে সাধারণত আগে নিবন্ধিত দলিলের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে মৌজার জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়। কোনো দলিলে জমির মূল্য কম দেখানো হলে পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত মৌজা মূল্যও প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় কম থেকে যেতে পারে। এভাবে কম মূল্য দেখানোর প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে সরকারি রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হয়।
একই সঙ্গে দলিলে প্রকৃত লেনদেনমূল্য উল্লেখ না থাকায় লেনদেনের একটি অংশ আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়। এর ফলে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কমিটির মতে, জমির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ এবং সেই মূল্যের ভিত্তিতে কর ও ফি আরোপ করা গেলে এ ধরনের সমস্যা কমানো সম্ভব।
প্রতিবেদনে অগ্রিম করের হার এক শতাংশ নির্ধারণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়েছে, একক হার চালু হলে কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ হবে, জটিলতা কমবে এবং প্রকৃত বাজারমূল্যে দলিল নিবন্ধনে উৎসাহ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তরমূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার অগ্রগতি পর্যালোচনায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ভূমিসচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে বিদ্যমান আইন পর্যালোচনা, আইন সংশোধনের সুপারিশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল সংস্কারের রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে। নিবন্ধন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জমির মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য সহজে যাচাইয়ের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচি এবং ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব কোরিয়ার (আইসিএকে) সহায়তায় ভূমি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ভৌগোলিক তথ্যের সমন্বয়ে জমির মূল্যায়ন মডেল তৈরি করে টেকসই ও বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি গড়ে তোলা এ প্রকল্পের লক্ষ্য। পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবে জমির মালিকানার সনদ বা সার্টিফিকেট অব ল্যান্ড ওনারশিপ (সিএলও) চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি। বর্তমানে কোনো জমির মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে নাগরিকদের খতিয়ান বা পর্চা, নামজারি, নিবন্ধিত দলিল, ভূমি উন্নয়ন কর এবং বন্ধক বা ঋণসংক্রান্ত তথ্যের জন্য বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সময় ব্যয় হয় এবং নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
প্রস্তাবিত সিএলও ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট জমি বা প্লটের মালিকানাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একটি সনদে সমন্বিতভাবে পাওয়া যাবে। এতে জমির বিবরণ, বর্তমান মালিকের তথ্য, মালিকানার অংশ এবং সংশ্লিষ্ট নথি অনলাইনে তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধানে পরিবর্তন, জমির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণে কার্যকর পদ্ধতি এবং বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবগুলো কার্যকর হলে জমি নিবন্ধনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রকৃত লেনদেনমূল্য প্রকাশ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আ র / এনজি






