রাত ১২:৫৩ | শনিবার | ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ | ৮ কার্তিক, ১৪৩৩, হেমন্তকাল | ১২ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগের উদ্যোগ : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিবেদন

 

মাহমুদুল হাসান

২৩ অক্টোবর ২০২৬

 

 

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে সরকার। এ উদ্যোগের লক্ষ্য ব্যাংক পরিচালনায় দক্ষতা বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম-দুর্নীতি কমিয়ে ব্যাংকিং খাতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

তবে সরকারের এ পরিকল্পনা নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, বাইরে থেকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হলে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কাজ করা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ সংকুচিত হয়ে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) সম্প্রতি জারি করা একটি নীতিমালার আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বাইরে থেকে নির্বাহী নিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকাটি অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বিশেষ কমিটির কাছে পাঠানো হবে। কমিটি চূড়ান্ত নাম অনুমোদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাড়পত্রের জন্য পাঠাবে।

এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের জন্য বিদ্যমান নির্বাহীদের মধ্য থেকে যে কাউকে বেছে নেওয়ার সুযোগ সরকারের রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার কিংবা বেসরকারি ব্যাংকের নির্বাহীরাও বিবেচনায় আসতে পারেন।

তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা বা নিষেধাজ্ঞা নেই। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠাবে।

সরকারের ধারণা, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে আনতে পারলে করপোরেট সুশাসন উন্নত হবে। একই সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমিয়ে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে গতি ফেরানো সম্ভব হবে।

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, এ উদ্যোগ তাঁদের দীর্ঘদিনের পেশাগত প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের বক্তব্য, বছরের পর বছর ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর এমডি হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হলে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যাংকার বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের সব নির্বাহী যে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট ঠেকাতে পেরেছেন, এমন নয়। ব্যাংক খাতের নানা সমস্যার মধ্যে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছে। ফলে শুধু বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রশ্ন তুলে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকে তুলনামূলক বেশি বেতন পাওয়া কর্মকর্তারা কেন কম বেতনের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে আসতে আগ্রহী হবেন, তা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন চাকরি করার পর শীর্ষ পদে যাওয়ার প্রত্যাশা তাঁদের জন্য স্বাভাবিক। একজন কর্মকর্তা বলেন, বছরের পর বছর ব্যাংকের সেবা করার পর অবসরে যাওয়ার আগে এমডি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে। বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হলে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ২৫ বছরের বেশি সময় কাজ করা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দায়ী করা যায় না। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকাও অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যার জন্য দায়ী।

তাঁর মতে, বাইরে থেকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন নেতৃত্বকে সহজে গ্রহণ না করলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাইরে থেকে আসা একজন নির্বাহীকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্যক্রম, আর্থিক অবস্থা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বুঝতে সময় দিতে হবে। ফলে শুরুতে তাঁর পক্ষে কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হতে পারে।

সম্প্রতি সরকার সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এর আগে বেসিক ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডিদের অবশিষ্ট মেয়াদও বাতিল করা হয়।

তবে এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি নিয়োগে নতুন এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নির্ভর করবে নিয়োগের মানদণ্ড, প্রার্থীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এবং ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কমানোর ওপর। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কাজ করা যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

 

মা হা / এনজি