রাত ১:০৮ | মঙ্গলবার | ২০ অক্টোবর, ২০২৬ | ৪ কার্তিক, ১৪৩৩, হেমন্তকাল | ৮ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮

স্বৈরাচারের আসার পথ উন্মুক্ত হলে দেশের পরিনাম ভালো হবে না —–প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ অক্টোবর ২০২৬

 

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিরোধী দলের বিরোধীতার রাজনীতির কারণে স্বৈরাচারের আসার পথ উন্মুক্ত হলে তার পরিনাম দেশের জন্য ভালো হবে না।  সোমবার জুলাই স্মৃতি স্তম্ভ এবং আধুনিকভাবে নির্মিত ওসমানি উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি এই মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, আমরা খেয়াল করছি বিরোধী দল বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করে যাচ্ছে। ঠিক আছে বিরোধিতা আপনারা করেন। আজকে বিরোধীতা করতে গিয়ে আপনারা যদি স্বৈরাচারকে আসার পথ উন্মুক্ত করে দেন তাহলে অবশ্যই সেটি দেশের জন্য কোন ভালো পরিণাম বয়ে আনবে না। সেটি যেমন জুলাইয়ের শহীদদের সাথে গাদ্দারি করা হবে, একইভাবে একাত্তরের এর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেও একইভাবে গাদ্দারি করা হবে।
সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে সচিবালয়ের পাশে আধুনিকভাবে নির্মিত ওসমানি উদ্যানের দ্বার উন্মোচন এবং উদ্যানে জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি উদ্যানের একটি গাছের চারা রোপন করেন।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ভেতরে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
এয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেটের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে বাংলাদেশের জনগণ যেভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন ঠিক একইভাবে অন্য যে রাজনৈতিক দলগুলো যাদের সাথে বিএনপি নির্বাচন করেছে সেই দলগুলোকে বাংলাদেশের জনগণ বিরোধী দলের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। অর্থাৎ সংসদের সরকারি দল বা বিরোধী দলের অর্থ হচ্ছে যে সেখানে জনগণের স্বার্থ দেশের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা হবে, আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত হবে। সিদ্ধান্তের পরে সেটি বাস্তবায়ন করা হবে। পরিষ্কারভাবে যদি আমরা বলি, আমরা দেখতে পাই, সেটি হচ্ছে যে, বিরোধী দল বিরোধিতা করার জন্যই শুধু বিরোধিতা করছে। আপাতত উদ্দেশ্যে আমাদের কাছে এটি মনে হচ্ছে। এখন বিরোধিতা করার জন্যই যদি বিরোধিতা হয় আমরা যদি সেই পুরনো কালচারে থেকে যাই তাহলে আমরা দেশকে সামনে কি করে এগিয়ে নিয়ে যাব?

বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে আহ্বান রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল অবশ্যই বিরোধিতা করবে। কিন্তু সেটি অবশ্যই গঠন মূলক বিরোধিতা হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমরা এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছি জুলাইতে যারা শহীদ হয়েছেন সেই শহীদদের ঘিরে। হ্যাঁ সরকার একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে শহীদের নিয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যারা তাদেরকে যেমন দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের নেতাসহ দলের যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদেরকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে। আমি যদি আজকে প্রশ্ন করি আপনারা(বিরোধী দল) ঠিক আছে আজকে দাওয়াতে আসলেন না। কিন্তু আপনারা যদি সরকারের এই মঞ্চে বসার দরকার ছিল না। সত্যিকারভাবে যদি আপনারা জুলাইকে ধারণ করেন। আপনারা তো এসে জুলাই শহীদ মানুষগুলোর সাথে তো বসতে পারতেন। কোথায়? আমরা তো আজকে আপনাদের দেখছি না। আজকে যদি আপনারা(বিরোধী দল) এই মানুষগুলোর মাঝেও এসে বসতেন, আমরা তাহলে বুঝতে পারতাম যে আপনারাও জুলাইতে ধারণ করেন, যেভাবে বিএনপি জুলাই ধারণ করে।

দোষারোপের রাজনীতি বাদ দিতে হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার চেষ্টা করছে দেশের মানুষের পরিবর্তনের জন্য। জনগণের ভোট নিয়ে যেমন বিরোধী দলে বসেছেন জনগণের সমর্থন নিয়ে আজ আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছি। বিরোধী দল মানেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব আর সরকারি দল মানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নয়, এইভাবে বোধহয় দোষারোপ করা বা এই যে ব্লেমিং এর যে রাজনীতি, এ থেকে বোধহয় আমাদের এখন বের হয়ে আসা উচিত।
সংসদে সব কিছুর সমাধান হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ আমরা সব ব্যাপারে হয়তো একমত হতে পারব না, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য, দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের স্বাধীনতার স্বার্থে, রাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থা, দেশের ভবিষ্যৎ সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থ থেকে শুরু করে এইসব বিষয়ে নিশ্চয়ই আমরা দ্বিমত পোষণ করার কোন কারণ নাই। এই বিষয়গুলোতে নিশ্চয়ই আমরা একমত হতেই পারি। সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধন সংস্কার এ সকল বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য থাকতেই পারে। এই সকল বিষয় ফায়সালা করার জন্যই জনগণ আপনাদেরকে এবং আমাদেরকে সংসদে পাঠিয়েছে। জনগণ এজন্যই আমাদেরকে সংসদে পাঠিয়েছে যে সংসদে বসে আমরা আলাপ আলোচনা করব, যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করব এবং সেখানে বসে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব। যাতে বাইরে জনগণ প্রতিদিনকার আমাদের যে জীবনযুদ্ধ সে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ বর্তমানে চায় স্থিতিশীলতা, জনগণ চায় শান্তি, জনগণ চায় দেশ এগিয়ে যাক। জনগণ চায় তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটুক। জনগণ যেভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা করতে চায়, নিজেদের স্বাধীনতা প্র্যাকটিস করতে চায়, জনগণ ভোটের অধিকার যেভাবে প্র্যাকটিস করতে চায় একইভাবে জনগন চায় যে আগামী দিনগুলো জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যাতে ধীরে ধীরে সুদৃঢ হয়ে গড়ে উঠুক। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং একই সাথে নিশ্চয়ই আপনারা খেয়াল করেছেন গত প্রায় দেড় মাস ধরে সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কর্মসূচি গ্রহন করেছি যাতে করে ডেঙ্গুকে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি। আমি শুধু বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে বলব, এডিস মশা কিন্তু সরকারি দলও চিনে না বিরোধী দলেও চিনে না, নিরপেক্ষ মানুষও চিনে না। কাজেই আসুন আমরা সরকার গঠন করার পরে প্রথম প্রথম কয়েকদিন দেখলাম ফজরের নামাজের পরে কারা জানি গিয়ে ঝাড়ু-টাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছে। এখন আর আমরা সেটি দেখতে পাই না। আসুন আমরা সকলে নিজেকে ডেঙ্গু নির্মূলে নিয়োজিত করি দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে আমরা সকলকে আমাদেরকে নিয়োজিত করি।

ওসমানি উদ্যানকে পরিস্কার রাখার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওসমানী উদ্যানের যে কমপ্লেক্সটি এটি আধুনিকায়ন। বহু বছর যাবৎ এটি বন্ধ হয়ে পড়েছিল বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে এটিকে সুন্দরভাবে সংস্কার করে স্মৃতিস্তম্ভ সম্পূর্ণভাবে তৈরি করে উদ্বোধন করছি। ওসমানি উদ্যানকে পরিস্কার রাখুন, ময়লা-আবর্জনা যাতে না ফেলে সেদিকে সকলে নজর রাখুন।
ঢাকা দক্ষিন সিটি প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলম বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ এর বাবা মীর মুস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেল প্রতি মন্ত্রী হাবিবুর রশীদ হাবিবসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্যগণ, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পরিবারের সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।

ডিএসসিসি পরিদর্শন : এদিকে সোমবার দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় নগর ভবন পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু বলেন, প্রধানমন্ত্রী নগর ভবন পরিদর্শন করেন। কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। ঢাকাকে সুন্দর রাখতে, পরিচ্ছন্ন রাখতে, বাসযোগ্য করতে তিনি তার বার্তাটি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবার কথা বাদ দেন, নিজের সন্তানের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একটি স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তুলি। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই চেষ্টা করি।

উপ প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার কথাও বলেন। কোথাও সড়ক বিভাজক নতুন করে তৈরি হচ্ছে, কোথাও বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এসব উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি আমার সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু নিজের ভেতরেও নিজের সমালোচনা করতে হবে। ভাবতে হবে, আমি আমার দায়িত্ব কতটুকু সঠিকভাবে পালন করছি, কতটুকু চেষ্টা করছি।

 

 

জা ই / এনজি