রাত ৯:৩৭ | বৃহস্পতিবার | ২২ অক্টোবর, ২০২৬ | ৬ কার্তিক, ১৪৩৩, হেমন্তকাল | ১০ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮

বিনিয়োগে নীতির নিশ্চয়তা চান বিদেশিরা, বড় বাধা জ্বালানি সংকট

বিশেষ প্রতিবেদন

মোঃ আল রশিদ

২২ অক্টোবর ২০২৬

 

বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগবান্ধব বিধিবিধান এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান চান বিদেশি বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন। সম্প্রতি  রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: বাংলাদেশে বিনিয়োগের চালিকাশক্তি’ শীর্ষক মধ্যাহ্নভোজ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সভায় বক্তারা বলেন, জ্বালানির উচ্চ ব্যয় ও সরবরাহ ঘাটতি শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে। এতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়ছে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা ও কার্যকর সংস্কার জরুরি।
শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং বলেন, জ্বালানি অনুসন্ধান ও উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক পরিবেশ প্রয়োজন। নীতিমালার ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিম দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে ভারসাম্যপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, জ্বালানির সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধি শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি রাজস্বের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং সাশ্রয়ী জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান নীতিগত নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগবান্ধব বিধিবিধানকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কাটিয়ে অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সরকারের অন্তত দুই বছরের সময় প্রয়োজন হতে পারে। এর চেয়ে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্যাসের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে এবং দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। তবে সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারের অস্থিরতার কারণে এ সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত সাত বিলিয়ন বা ৭০০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। ভবিষ্যতে এ খাতে আরও কত ব্যয় হতে পারে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমাতে আরও তিন থেকে চারটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। এসব প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত ইউনিটগুলো চালু হতে আনুমানিক ১৮ মাস লাগতে পারে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ নিয়েও আলোচনা চলছে। বড় জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস এবং পরিবহন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে মাতারবাড়ীসহ কৌশলগত কয়েকটি স্থানে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৌশলগত তেল মজুতাগার এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো স্থাপনের বিষয়টিও মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এলএনজি আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির সঙ্গে উৎপাদন-অংশীদারত্ব চুক্তির আওতায় স্থল ও সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাপেক্সের মাধ্যমে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।

 

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমেছে। ফলে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এ নির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিশেষ করে ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে কর-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সরকারের প্রত্যাশা, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিকৃত জ্বালানির চাহিদা হ্রাস পাবে।

জ্বালানি খাতের বাইরে ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, পুঁজিবাজারে আস্থা পুনর্গঠন এবং রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বৈশ্বিক পুঁজিবাজারের আগ্রহও বাড়ছে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ জ্বালানি বিভাগের প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম।

 

 

আল / এনজি