নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ জুলাই ২০২৬
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে আনতে সবার সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বজ্য অব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা শুধুমাত্র নগর প্রশাসন কিংবা পুলিশ দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এ জন্য প্রয়োজন ছোট বড় প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ।
প্রতিটি নাগরিকের প্রতি উদাত্ত আহবান, অনুগ্রহ করে যেখানে সেখানে বর্জ্য কিংবা উচ্ছিষ্ট ফেলবেন না।
ঘরে কিংবা বাইরে সবসময় সকল বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলুন। নিজে সুস্থ থাকুন-নিজের পরিবারের জন্যও পরিবেশ সুন্দর রাখুন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপন অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০২৬ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী পবিত্র কোরানের একটি আয়াত উল্লেখ করে বলেছেন, আল্লাহ বলছেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব মাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন’। সুতরাং, নদি নালা – গাছপালা, কীট পতঙ্গ, বন্য কিংবা গৃহপালিত প্রাণী অর্থাৎ আমাদের চারপাশ, পরিবেশ প্রতিবেশ অর্থাৎ আল্লাহর এই সকল সৃষ্টি — সবই মানুষের জন্য উপকারী। তবে আল্লাহর সকল সৃষ্টি থেকে উপকার ভোগ করতে হলে, মানুষ হিসেবে আমাদের অবশ্যই কিছু দায়িত্ব এবং কর্তব্য রয়েছে। যথানিয়মে সকল সৃষ্টির যত্ন এবং পরিচর্যা করা মানব সমাজের দায়িত্ব।
তারেক রহমান বলেন, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে এটি প্রমাণিত সত্য, বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মানব সমাজের সম্পর্ক গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য। বাস্তুতন্ত্রের নিরাপদ লালন এবং বিকাশের সঙ্গে মানব সমাজের নিরাপদ বেড়ে ওঠা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং, আজকের এই পরিবেশ মেলা কিংবা বৃক্ষমেলার আয়োজন, এটি কিন্তু বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ বলেই আমি মনে করি।
যারা এই আয়োজন করেছেন, যারা এই আয়োজনে সম্পৃক্ত হয়েছেন আমি আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাই।
এই আয়োজন কেবলমাত্র একটি বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং বৃক্ষরোপন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো বিষয়কে আমাদের নৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে
অবশ্যই আমরা একটি স্বাস্থ্যকর বসতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।
তোমাদের মতো বিচক্ষণ শিক্ষার্থী এবং প্রতিশ্রুতিশীল তারুণ্যই একটি ‘সবুজ বসতি’ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
বৃক্ষরোপনের প্রয়োজনীয়তা এবং উপকারিতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃক্ষরোপন কিংবা সবুজায়নের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি অবগত। আপনার-আমার -আমাদের আগামী প্রজন্মের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্যই সবুজায়ন জরুরি। একটি সন্তান পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলে , আসুন আমরা একটি করে গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে প্রতিটি প্রাণের জন্মকে উদযাপন করি, স্মরণীয় করে রাখি।
একজন নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠুক। এভাবেই এগিয়ে যাক সবুজায়নের জন্য সামাজিক আন্দোলন।
সবুজায়নের সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবেও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন,
বর্তমান সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালু করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একইসঙ্গে, ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ চালু এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্ট-আপ ফান্ডসহ বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে
বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গঠন
অসম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পাঁচ বছরে নতুন করে ২৫ কোটি গাছ রোপনের কর্মসূচি নিয়েছে। তবে ইচ্ছেমতো গাছ রোপন করলেই উদ্দেশ্য সাধিত হবেনা। বরং কোন পরিবেশে
কোন প্রকারের মাটিতে, কি ধরণের আবহাওয়ায়, কোন প্রজাতির গাছ রোপন করা দরকার, এগুলি পরীক্ষা নিরীক্ষা খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যেমন ইউক্যালিপটাস কিংবা আকাশমণি প্রজাতির গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে, কিন্তু এ ধরণের গাছ আমাদের পরিবেশের জন্য কতটা উপযোগী সেটি অবশ্যই গবেষণার দাবি রাখে।
আমি মনে করি, নতুন বৃক্ষরোপনের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতির গাছ যেমন ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয়, বনজ, ফলদ, অর্থকরী এবং বিপন্ন প্রজাতির গাছ রোপন অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
তবে বৃক্ষরোপন কিংবা বনায়নই শেষ কথা নয় বরং এই বনায়ন, পশু পাখি, বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জন্য নিরাপদ বাসস্থান কিংবা প্রয়োজনীয় আহারের যোগান দিতে পারে কিনা, এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার ক্ষেত্রে
পরিবেশবিদ এবং বনবিদগনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার
সুযোগ রয়েছে।
গাছপালা ও প্রাণী অর্থাৎ সকল জীব এবং মাটি, পানি ও বায়ু অর্থাৎ জড় পরিবেশ সবকিছুই যাতে স্বাভাবিকভাবে মিলেমিশে থাকতে পারে, বনায়নের মাধ্যমে এমন একটি বাস্তুতন্ত্র বজায় এবং বহাল রাখাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। পরিবেশ এবং বৃক্ষমেলায় উপস্থিতিদের উদ্দেশ্যে বলেন, যারা এই বক্তব্য শুনছেন কিংবা
পরবর্তীতে হয়তো শুনবেন, আরো একটি বিষয়ের প্রতি আমি আপনাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই,
সেটি হলো, নতুন বৃক্ষরোপন অবশ্যই জরুরি তবে রোপিত গাছ নিরাপদে বেড়ে উঠছে কিনা কিংবা বেড়ে উঠতে পারছে কিনা সেটি নিশ্চিত করা তার চেয়েও বেশি জরুরি। আর যুগ যুগ ধরে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের অংশ হয়ে যাওয়া, বিদ্যমান গাছগুলোকে কেটে না ফেলে, জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমি আশা করি, বনবিভাগ সেটি নিশ্চিত করবে। সরকার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস এবং বন্যপ্রাণী নিধনের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
মানব সমাজ নিজেদের স্বার্থেই, মাটি, নদী, বন, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমরা যদি আমাদের নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারি,
তাহলে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা পানির নিরাপত্তা
কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবেনা। এ কারণেই বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা জরুরি। উন্নয়ন ও পরিবেশকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে বরং প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রেখে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি গড়ে উঠুক,
একটি বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা।
ছাদবাগান, নগর বনায়ন, জিআইএসভিত্তিক বৃক্ষরোপণ,
নদীতীর ও খালের দুপাশে সবুজায়ন এবং ইকো-ট্যুরিজমকে সরকার অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র হিসেবেও বিকশিত করতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এটি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কার বিষয় নয়। বরং এটিই এখন আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ কিংবা দাবদাহ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা,
আমাদের কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি সর্বোপরি জন জীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার পরিবেশকে কোনো আলাদা খাত হিসেবে নয়,
বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
বর্তমান সরকারের লক্ষ্য এমন একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন, জলবায়ু-সহনশীল টেকসই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণ পাশাপাশি এগিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, বৃক্ষরোপনের পাশাপাশি বর্তমান সরকার সারাদেশে
২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে, সেটি শুধুমাত্র কৃষকদের জন্য বছর জুড়ে কৃষি সেচ সুবিধাই নিশ্চিত করবেনা, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তবে পরিবেশের উন্নয়ন শুধুমাত্র বৃক্ষরোপন কিংবা খাল খননের ওপরই নির্ভর করেনা।
রাজধানীসহ বিশেষ করে সারাদেশের সকল নগর বন্দর এবং শহরতলীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও আমূল পরিবর্তন আনার কোনো বিকল্প নেই।
প্লাস্টিক বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে/ সরকার ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। একইসঙ্গে জৈব সার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং Reduce, Reuse, Recycle এই 3Rs নীতিকে
সরকার জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে আনতে হলে এটি শুধুমাত্র নগর প্রশাসন কিংবা পুলিশ দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এ জন্য প্রয়োজন ছোট বড় প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ।
প্রতিটি নাগরিকের প্রতি উদাত্ত আহবান, অনুগ্রহ করে যেখানে সেখানে বর্জ্য কিংবা উচ্ছিষ্ট ফেলবেন না।
ঘরে কিংবা বাইরে সবসময় সকল বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলুন। নিজে সুস্থ থাকুন-নিজের পরিবারের জন্যও পরিবেশ সুন্দর রাখুন।
মানব সমাজের সুস্থ এবং নিরাপদ জীবনের জন্য আমরা বৃক্ষরোপন কিংবা পরিবেশ সংরক্ষন
নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নদী ও জলাভূমি ভরাট এবং বন উজাড়সহ নানাকারণে
জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
এ সব কারণে বন্যপ্রাণী জলজ উদ্ভিদ এবং প্রাণীর আবাসস্থলও অস্তিত্ব সংকটে বাধ্য।
সুতরাং, বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষনের মাধ্যমে বন্য প্রাণী, পোষ্য প্রাণী কিংবা পশুপাখি, এই সবরকম প্রাণীর নিরাপত্তা বিধান করতে না পারলে, যত উদ্যোগী নেয়া হোক মানব সমাজের জন্যও নিরাপদ থাকা সম্ভব নয়।
বন্য প্রাণীর প্রতি নির্দয় হবেননা।
কুকুর বিড়ালের প্রতি অমানবিক আচরণ করবেন না।
মানব সমাজের নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রতিটি প্রাণীর প্রতিটি প্রাণের নিরাপত্তায় সরকারের পাশাপাশি নাগরিক উদ্যোগও জরুরি।
এ বছর যারা জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার এবং সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশ অর্জন করেছেন, তাদেরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাফর / এনজি






