জেলা প্রতিনিধি, বগুড়া
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তারা। কেউ কৃষিজমিতে কাজের জন্য, কেউ দিনমজুরের কাজ খুঁজতে গিয়েছিলেন বগুড়ার এরুলিয়ার কামলার হাটে। উদ্দেশ্য ছিল দিন শেষে পরিবারের জন্য দুমুঠো খাবার জোগাড় করা। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সবকিছু বদলে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারানো শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসের নিচে চাপা পড়ে নিভে যায় ৭টি প্রাণ। আর সেই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মর্গ এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
স্বামী আবু সাঈদ মণ্ডলের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রিনা বেগম। কখনো মরদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, কখনো বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেলে?’ পাশে থাকা স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো সান্ত্বনাই যেন তার বুকের শূন্যতা পূরণ করতে পারছিল না।
আবু সাঈদ ও আমিরুলের স্বজন সানাউল প্রধান বলেন, ২ জনই দিনমজুর ছিলেন। সাঈদের পরিবারের সদস্য ৬ জন। সংসারের সব দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। কাজের সন্ধানে বগুড়ায় এসেছিলেন, কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হলো না।
নিহত নূর মোহাম্মদের ভাতিজা আল আমিন বলেন, ফজরের নামাজ পড়ে চাচা কামলার হাটে গিয়েছিলেন কৃষি শ্রমিক নেওয়ার জন্য। কে জানত, সেটাই হবে তার জীবনের শেষ পথচলা।
তিনি বলেন, প্রতিদিনের মতো আমারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার একটু দেরি হয়ে যায়। পরে গিয়ে দেখি চারদিকে মানুষের ভিড়, রক্তাক্ত মানুষ আর আর্তনাদ। তখন আহতদের উদ্ধারে অন্যদের সঙ্গে আমিও এগিয়ে যাই।
আরেক শ্রমিক মোশাররফ হোসেন সরকার বলেন, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শ্রমিকরা এই হাটে আসেন। বর্তমানে কৃষি কাজে একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ৭০০ টাকা মজুরি পান। সেই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করে অসংখ্য পরিবারের জীবন।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের সদর উপজেলার এরুলিয়া সিলকিবান্ধা এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে কাজের অপেক্ষায় থাকা কৃষি শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলে ৩ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন।
নিহতরা হলেন— তাজিমুল (৪৭), বেল্লাল হোসেন, আবু সাঈদ (৪৫), আনারুল (৫৫), আমিরুল (৪০), নূর আলম (৪৫) ও জমির মালিক নূর মোহাম্মদ (৭৬)।






