বিশেষ প্রতিবেদন
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স নয় মাসের কম। অনেক রোগীরই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ও পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) প্রয়োজন হলেও আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় কাউকেই আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আইসিইউ ও পিআইসিইউর জন্য সিরিয়াল দেওয়া হলেও কবে নাগাদ সুযোগ মিলবে— তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না চিকিৎসকেরা।

এদিকে, কিশোরগঞ্জ থেকে শফিকুল ইসলাম সাড়ে তিন মাস বয়সী শিশু আবু হুরাইরাকে নিয়ে শনিবার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে আসেন। রোববার (২৯ মার্চ) সকাল থেকেই শিশুটির অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাকে পিআইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ সংবাদ শোনার পর শফিকুল ইসলাম দিশেহারা হয়ে শিশু হাসপাতালসহ আশেপাশের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউ খোঁজেন।
শিশু হাসপাতালে পিআইসিইউর জন্য সিরিয়াল দিতে গেলে তার সিরিয়াল পড়ে ৩৬ নম্বরে। কবে নাগাদ সিরিয়াল অনুযায়ী আইসিইউ পাওয়া যাবে— তা বলতে পারছেন না কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা। এদিকে, রোগীর অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে।
গাজীপুর থেকে ছয় মাসের শিশু আয়মানকে নিয়ে আসা মো. বেলাল হোসাইন বলেন, ‘গত মঙ্গলবার জ্বর ও বমি নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর এখানে জানানো হয় যে, বাচ্চার হাম হয়েছে। পরে তাকে এই ইউনিটে ভর্তি দেওয়া হয়। গত তিন দিন ধরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকেরা পিআইসিইউর কথা বলেন।’
ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স নয় মাসের কম। অনেক রোগীরই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ও পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) প্রয়োজন হলেও আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় কাউকেই আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আইসিইউ ও পিআইসিইউর জন্য সিরিয়াল দেওয়া হলেও কবে নাগাদ সুযোগ মিলবে— তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না চিকিৎসকেরা
তিনি বলেন, ‘পিআইসিইউ খোঁজ করলে হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, হঠাৎ করে হামের সংক্রমণ বাড়ায় আলাদা ইউনিট করা হলেও এখনও আইসিইউ বা পিআইসিইউর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।’
তিনি জানান, পরে ঢাকা মেডিকেলে খোঁজ নিলে সেখানে পিআইসিইউ পাওয়া গেলেও রোগীর কেস স্টাডি দেখে তা বাতিল করা হয়। কারণ হিসেবে জানানো হয়, এ রোগীকে পিআইসিইউতে নিলে অন্য রোগীদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের কর্তব্যরত একাধিক চিকিৎসক জানান, প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বর্তমানে ভর্তি থাকা অধিকাংশ শিশুর বয়স নয় মাসের কম। হামে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি ১৩ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এছাড়া, নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ছে, যাদের এখনও টিকা নেওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন গত আট বছরে অনেকেই হামের টিকা নেয়নি, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তিনি নতুন করে টিকা কেনার জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন যে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে এবং কোভিডের মতো টিকাদানের হার ধরে রাখতে না পারলে হাম মোকাবিলা করা কঠিন হবে
তাদের মতে, ‘হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর জটিলতায় ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহ হতে পারে। এসব রোগীকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।’
শিশু সংক্রামক রোগ ও কমিউনিটি শিশুস্বাস্থ্য ইউনিটের ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘বিগত বছরের তুলনায় এবার হামের সংক্রমণ অনেক বেশি। এটি ধীরে ধীরে মহামারির আকার ধারণ করছে। আমরা জরুরি ভিত্তিতে একটি ইউনিট চালু করেছি, তবে আইসিইউ ও পিআইসিইউ দিতে পারছি না। কারণ, হামের রোগীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা আইসিইউ ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকার প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশনসহ আইসিইউ ও পিআইসিইউর যন্ত্রপাতি সরবরাহ করলে আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে এ সেবা চালু করতে পারব।’

তিনি জানান, হামে আক্রান্ত রোগীদের সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দিতে হয়। এটি এতটাই সংক্রামক যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে ১৮ জন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। বিশেষ করে নয় ও ১৫ মাস বয়সী যেসব শিশু এখনও টিকা পায়নি তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার কারণ হিসেবে ডা. জিয়া বলেন, ‘২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই বছর বিশ্বজুড়ে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। ফলে একটি বড় গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যার কারণে অনেক শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।’
জ উ/ এনজি






