বিকাল ৩:২৬ | মঙ্গলবার | ১৮ আগস্ট, ২০২৬ | ৩ ভাদ্র, ১৪৩৩, শরৎকাল | ৪ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮

‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ অনুযায়ী স্থলাভিষিক্ত : ২১ জানুয়ারির আগেই বিএনপির চেয়ারম্যান হবেন তারেক রহমান

বিশেষ প্রতিবেদন

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

০৫ জানুয়ারি ২০২৬

 

 

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দ হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। নিয়ম অনুযযায়ী তার আগে দলীয় প্রধানের নাম নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে। এক্ষেত্রে গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলটির প্রধানের পদ শুন্য হয়ে যায়। ফলে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের আগেই তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে যাচ্ছে বিএনপি। জানা গেছে, ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ অনুযায়ী গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলীয় প্রধানের শূন্য পদে তারেক রহমানকে স্থলাভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

সূত্র মতে, আদালতকে ব্যবহার করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করলে দলীয় গণতন্ত্র অনুযায়ী দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইনি জটিলতা ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকায় দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারেক রহমান একই পদের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য জানান, দলীয় গণতন্ত্র অনুযায়ী খুব শিগগির দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে নির্বাচিত করা হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু খালেদা জিয়া মারা গেছে, আবার প্রতীক বরাদ্দের আগে দলীয় প্রধানের নাম নির্বাচন কমিশনকেও জানাতে হবে। হাতে সময়ও কম। তাই শিগগির গণতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে নির্বাচিত করা হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গণমাধ্যমকে বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, পুরো দেশ অভিভাবকহীনতায় আছে। তার ছেলে তারেক রহমানও শোকে মুহ্যমান। এ রকম পরিস্থিতিতে দলের পদ-পদবি নিয়ে কারও কোনো চিন্তা নেই। তবে অবশ্যই তারেক রহমান এখন দলের চেয়ারম্যান।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গঠনতন্ত্রের ৭ (গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ৩ অনুযায়ী চেয়ারম্যান হয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, যে কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বাকি মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।

গঠনতন্ত্রের এ বিধানের কারণে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের নিযুক্তির জন্য আলাদা কোনো ঘোষণা দেওয়ার দরকার নেই। যদিও দলের বিভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এখনও তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য যে নির্বাচনী আচরণবিধিমালা প্রণয়ন করেছে, তার ৭ ধারার চ উপধারায় বলা হয়েছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী কেবল তার বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ছাপাতে পারবে। এবারের নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ। কিন্তু ব্যানার, ফেস্টুন চলবে। তাই দলীয় নিবন্ধিত দলের প্রার্থীর পাশাপাশি দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। তাই প্রতীক বরাদ্দের আগেই বিষয়টি ইসিকে জানাতে হবে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে দুটি উপায় নিয়ে এগোচ্ছেন তারা। একটি হচ্ছে, দলের স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতভাবে তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। আরেকটি হচ্ছে, দলের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে স্থায়ী কমিটি তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারে। সেখানে মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রত্যাহার এবং ভোটের আয়োজনে তফসিল ঘোষণা করতে পারে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কেউ প্রার্থী না হলে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন।

তবে তারেক রহমান চেয়ারম্যান হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান কে হবেন, তা নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে দলে এবং দলের বাইরে। কেউ কেউ তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে আলোচনায় রাখছেন। ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে জাইমা রহমানের মাঝে দাদি খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছেন।

একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনী ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, প্রচারপত্র এবং ডিজিটাল পোস্টারে দলের চেয়ারপার্সনের ছবি ছাপানো আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর মারা গেছেন। যদিও দলের প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ব্যানার ও ডিজিটাল পোস্টার তৈরি করেছেন, যেখানে খালেদা জিয়ার ছবি রয়েছে। তার মৃত্যুতে প্রচারণার পরিকল্পনা কিছুটা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও কৌশলগত কারণে এই পদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন করা হয়নি। দলের নেতা ও প্রার্থীদের প্রচারণায় কোন ছবি ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামতের পরও তারেক রহমান তা এখনই কার্যকর না করার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক একটি বাস্তবতার কারণে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করার জন্য মত দেন তারেক রহমান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নেতা জানান, স্থায়ী কমিটির নেতারা ইতোমধ্যে তারেক রহমানকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান করে রেজ্যুলেশন করার পক্ষে। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তা বারণ করেছেন। তিনি তার মায়ের শোকের বিষয়ে সতর্ক। কিছুটা সময় নিতে চাচ্ছেন। তবে বাস্তবে সব সিদ্ধান্ত, দিকনির্দেশনা ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারিত হচ্ছে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করেই। সময় হলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও আসবে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাচনী পোস্টারে দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানতে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সে জন্য শিগগিরই কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

বিএনপি নেতা-কর্মীদের অনেকে বলছেন, দলের মরহুমা চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও এবারের নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে থাকবেন তিনি। তার মৃত্যু- শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবে বিএনপি। বিশেষ করে মৃত্যুর আগে দল-মতের ঊর্ধ্বে স্থান পাওয়া নেতা খালেদা জিয়ার তার জানাযা ও শেষ বিদায়ে মানুষের বাঁধভাঙা উপস্থিতি এবং বহির্বিশ্বের শ্রদ্ধা নির্বাচনে কাজ লাগানোর চেষ্টা থাকবে। অর্থাৎ জনসমর্থনের ঢেউকে ভোটে রূপান্তরের চেষ্টা। বিএনপির লক্ষ্য, এই আবেগকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখা। সে জন্য প্রতিটি আসনে প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা বলেন, ভোটের মাঠে দলের স্পষ্ট বার্তা থাকবে যে খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু বিএনপির কর্মসূচির মধ্যে তার আদর্শ, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব জীবিত থাকবে।

এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন তারেক রহমান। রোববার সন্ধ্যায় সিলেট নগরের উইন্ডসর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান পদ শূন্য রয়েছে। সেই শূন্যতা পূরণে তারেক রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অতীতের মতো এবারও বিএনপি সিলেট থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবে।

 

 

জা ই / এনজি