বিশেষ প্রতিবেদন
০৬ নভেম্বর ২০২৬
আগামীকাল ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। মহান বিপ¬ব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপূর্যপূর্ণ ও বহুল আলোচিত দিন এটি। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গণে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রের গতিপথে গুরুত্বপূণ প্রভাব ফেলেছিল। দিনটি কারও কাছে জাতীয় সংসহতি ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক, কারও কাছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক জটিল অধ্যায়। কিন্তু মত প্রার্থক্য সত্ত্বেও একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না ‘৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরী করে। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপনে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশে¬ষকদের মতে, এ দেশের মানুষ মনে করেন, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর না হলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্নরকম হতে পারতো। এ জন্য যতদিন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ থাকবে, এর ইতিহাসে ৭ নভেবম্বর একটি উলে¬খযোগ্য স্থান দখল করে থাকবে। রুশ-ভারতের অক্ষশক্তির চক্রান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যগণ গর্জে ওঠেছিল সেদিন। আজকে সংহতি দিবসের প্রেক্ষাপটেও সেই সিপাহী-জনতার অনন্য সাধারণ বিপ্ল¬বের মতো স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে অভিন্ন প¬্যাটফর্মের অটুট ঐক্য দরকার। এ সময়ে আরও দরকার বর্ণ চোরাদের ব্যাপারে সজাগ থাকা।
সংকটের ভেতর দিয়ে একটি ঐতিহাসিক দিন : স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিশ্চয়তার মুখোমুখী হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানহত্যাকান্ড এবং ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ’্যত্থানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠে। ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর ভেতরে বিদ্রোহ, সৈনিকদের অংশগ্রহণ এবং রাজলৈনতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তণ আসে। এ সশয় জিয়াউর রহমান গূরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সামনে আসেন।
এই ঘটনাকে ঘিরে ইতহাসের ব্যাখ্যা এক নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিেেজদের অবস্থান থেকে দিনটির তাৎপর্য নির্ধারণ করেছে। তবে ইতহাসকে কেবল দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে তার পূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায় না। বরং ঘটনা প্রবাহের কারণ, পরিণতি এবং রাষ্ট্রেপর ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বে প্রশ্ন : ৭ নভেম্বরের আলোচনায় জাতীয় সংহতি ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে াবংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুত্কিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিথ স্বাধীনতা কেবল একটি ভ’খন্ডের স্বাধীনতা নয়, এটি জনগণের আত্ন মর্যাদা, রাজনৈরতিক অধিকার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত থাকে জনগণের ঐক্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার মধ্যে। মত ও পথের প্রার্থক্য থাকলেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের মর্যাদার প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। তবে জাতীয় ঐক্য মানে ভিন্ন মতকে স্তব্ধ করে দেওয়া নয়। প্রকৃত ঐক্য গড়ে উঠে পারষ্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায় বিচার এবং সবার রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিৎ করার মধ্য দিয়ে।
কি বলছেন সংশ্লিষ্টরা : প্রতি বছরই ৭ নভেম্বর পূর্বদিকে সূর্য ওঠে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। তবুও যেন দিনটি আসে নবতর আবেদন নিয়ে। এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ভাগ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে তাদের রুখবার এ আবেদন কি কখনো পুরানো হবার? কর্নেল (অব.) শাফায়াত জামিলের ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ গ্রন্থে এ ভয়াবহ ও ষড়যন্ত্রের স্বরূপ তিনি নিজেই উন্মোচন করেছেন তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর কিভাবে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলো, কারা করলো, কিভাবে তাকে বন্দী করা হলো এবং পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পর কিভাবে জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করা হলো, কারা সহযোগিতা করলো, কারা করলো না, কিভাবে সিপাহী বিপ¬বের লিফলেট ছড়িয়ে পড়লো এবং কেন তারা ব্যর্থ হলেন। একজন অভ্যুত্থানকারী সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি তার ভাষায় উক্ত গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। তবে এ থেকে ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অরাজক পরিস্থিতির একটি বিবরণ পাওয়া যায়। আর তা থেকেই ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব জাতির সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কার্যত অক্টোবরেই অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করা হয়। ৩ নভেম্বর থেকে সেনাবাহিনীতে শুরু হয় এক ভয়ানক আত্মঘাতী সংঘাত। সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে সংঘটিত হয় ব্যর্থ অভ্যুত্থান, ভেঙ্গে ফেলা হয় সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’। মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় অফিসার ও জওয়ানদের। এ সময় জেলখানার অভ্যন্তরে সংঘটিত হয় চার নেতা হত্যাকান্ড, প্রেসিডেন্টকে করা হয় ক্ষমতাচ্যুত, সংবিধান স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েমকে করা হয় নতুন প্রেসিডেন্ট। জনপ্রশাসনে শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা। এ সময় দেশে জারি করা হয় সামরিক শাসন। জাতির ভবিষ্যৎ থেকে যায় অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। জাতির এমনি এক ক্রান্তিলগ্নে ইথারে ভেসে আসে একটি ভাবগম্ভীর কণ্ঠস্বর- ‘প্রিয় দেশবাসী, আমি জেনারেল জিয়া বলছি…।’
একাত্তরের দিক নির্দেশনাহীন দিনগুলোর মতো আবার জিয়ার কণ্ঠস্বর শুনে জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। নাগরিকদের মনে পড়ে ৭ নভেম্বর সুবহে সাদিকের পর ঢাকার রাজপথে ট্যাংকের চাকার গর গর আওয়াজ ছাপিয়ে প্রকম্পিত হয়ে উঠা ‘নারায়ে তাকবীর- আল¬াহ আকবর’ ধ্বনির কথা। ট্যাংকের ওপর সেদিন অনেক উৎসাহিত জনতাকে লাফিয়ে ওঠে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে কোলাকুলি করতেও দেখা গেছে। সিপাহী-জনতার কণ্ঠে মুহুর্মুহু ধ্বনিত হয়েছে ‘সিপাহী-জনতা ঐক্য অমর হোক, জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহী-জনতা ঐক্য গড়ো, বাংলাদেশ রক্ষা করো।’ অতঃপর ৭ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ডেপুটি চীফ মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর নিয়োগ করেন। জেনারেল জিয়া দায়িত্বগ্রহণের পর প্রথমেই দক্ষতার সাথে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। এভাবেই জিয়া বাংলাদেশীদের জন্য হয়ে ওঠেন ‘ত্রাণকর্তা’।
বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট সাদেক খানের ভাষায়- ‘১৯৭৫ সালের সিপাহী জনতার বিপ¬বের মধ্যদিয়ে কৃত অর্থে বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়।’ প্রসঙ্গত, ৬ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নির্দেশে সেনাবাহিনীতে ছড়িয়ে পড়ে ‘সিপাহী বিপ্লব’ শিরোনামে একটি লিফলেট। ফলে মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ সমর্থিত সিপাহীরা দ্রুততার মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে সমর্থ হয়। ঐক্যবদ্ধ সিপাহী-জনতা ছিনিয়ে আনে ৭ নভেম্বরের সাফল্যের বিজয়গাঁথা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ দিনের তাৎপর্য নিয়ে বিÍর্ক থাকতে পারে, ব্যাখ্যারও প্রার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্ক যেন জাতীয় বিভক্তিকে আরও গভীর না করে বরং ইতহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের পথ তৈরী।
বিপ্লব দিবসের শিক্ষা : ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা। রাজনৈতিক সংকট যখন স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে সমাধানের পথ খোঁজে, তখন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও জনগণেরঅধিকার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশের অবিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক সরকার, দায়িত্বশীল বিরোধী দল এবং স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক দল গনতন্ত্রের কথা বললেই তার গণতান্ত্রিক চরিত্র নিশ্চিৎ হয় না। ক্ষমতায় থ্কাাকালে বিরোধী মতের প্রতি তার আচরণ, নির্বাচণী ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা এবং নাগিরক অধিকারের সুরক্ষাই প্রকৃত পরীক্ষা। একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব হলো শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সাংবিধানিক পদ্ধতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
ইতিহাসকে দলীয় বিরোধের উর্ধ্বে দেখা : বাংলাদেশের রাজনৈতি ইতিহাসের একটি বড় দুর্বলতা হলো , গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনাগুলো প্রায়ই দলীয় প্রতিদ্বন্ধীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে কেউ সম্পূর্ণ মহিমান্বিত করেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের জটিলতা বুঝতে সাহায্য করে না।
৭ নভেম্বরের ক্ষেত্রেও ড্রয়োজন তথ্য নির্ভল আলোচনা, ভিন্নমতের প্রতি সম্ম্নান এবং ইতিহাসের সব প্রাসঙ্গিক দিক বিবেচনা করা। জিয়াউর রহমানের ভূমিকা মূল্যায়নের সময় তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা যেমন আলোচনায় আসবে, তেমনী ওই সময়ের সামরিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং গণতারিÍ্রক বিকাশের সীমাবদ্ধতাও আলোচজনার অংশ হওয়া উচিৎ। ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ মানে অতীতকে ভুলে যাওয়া নয় বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের ভ’ল এড়িয়ে চলা। জাতীয় ইতিহাস কোনো একটি দলের একক সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জাতির অভিজ্ঞতা, অর্জন ও শিক্ষার সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে : আজকের াবংলাদেশের সামনে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দূর্ণীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা পিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। ৭ নভেম্বরের চেতনা নিয়ে আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা জাতীয় ঐক্য, জনগণের অধিকার এবং রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভ’মিকা রাখবে। অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভক্তি বাড়ানোর পরিবর্তে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। তরণ প্রজন্ম এমন একি াবংলাদেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে, অন্যঅয়ের বিচার হবে, ভোটের মর্যাদা থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পেতে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচ্য হবে না। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এভং ভিন্নমত পোষণ করলেই কাউকে শত্রু বিবেচনা করা হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী : ‘ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল।
তিনি বলেন, ‘যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।’
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক দিনটি ছিল বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন।’
তারেক রহমান বলেন, ইতিহাস সাক্ষী, দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের পথ ধরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর পরাজিত সেই অপশক্তি মহাজোটের নামে একজোট হয়ে দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বিডিআর পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছিল। জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল। হাজারো শহিদের আত্মত্যাগ এবং বীর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর অবশেষে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। ২০২৪ সালে যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় রাজপথে নেমে এসেছিল, একইভাবে ১৯৭৫ সালেও সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল। ভবিষ্যতে যাতে কেউ দেশ ও জনগণের অধিকার হরণ করতে কিংবা দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে হলে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে। গণঅভ্যুত্থান—ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে প্রতিটি বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটাই। তা হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর ও নিরাপদ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী চক্রান্ত নস্যাৎ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সংঘটিত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের এই ঐতিহাসিক দিনে দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক—‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে প্রেরণা ও পাথেয় হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
কর্মসূচি : ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। । এদিন দেশে সাধারণ ছুটি থাকবে। দিবসটি উপলক্ষে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। দেশের সব মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত করা হবে। পাশাপাশি মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশুকেন্দ্র, শিশু পরিবার, শিশুসদন, কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র, শান্তি নিবাস ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। দেশের সব শিশু পার্ক শিশুদের জন্য দিনব্যাপী বিনা টিকিটে উন্মুক্ত থাকবে। দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ নিবন্ধ, সাহিত্য-সাময়িকী ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে।
জা ই / এনজি






