রাত ১২:৩৭ | রবিবার | ২৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৮ ভাদ্র, ১৪৩৩, শরৎকাল | ৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা

মতামত

 

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষ আছেন, যাদের পরিচয় কেবল দলীয় পদ-পদবি দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। তাদের জীবন রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, আন্দোলন, ব্যক্তিগত বোধ ও দীর্ঘ সামাজিক পথচলারও এক সমান্তরাল ইতিহাস। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদেরই একজন।

১৯৯১ সালের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এ যেন দীর্ঘ এক নদীর যাত্রা—উৎসে পাহাড়ি ঝরনা, মাঝপথে পাথর, ঘূর্ণি ও খরস্রোতা, আর শেষে এসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রশান্ত এক মোহনা। কিন্তু রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসা আর রাষ্ট্রের মানুষের হৃদয়ে একজন অভিভাবক হয়ে ওঠা এক কথা নয়। পদ মানুষকে বড় করে; কিন্তু মানুষ পদকে বড় করে তোলেন তার আচরণ, ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও উদারতার মধ্য দিয়ে।

সেখানেই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি পারবেন? মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতি দিয়ে জীবন শুরু করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন; সরকারি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন।

তার ছাত্রজীবনের রাজনীতিও ছিল আন্দোলনমুখর। ষাটের দশকের শেষভাগে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন; এ সময় তিনি গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করেন। পরবর্তী সময়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৮৬ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অর্থাৎ তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল একটি পৌরসভা থেকে—রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ থেকে নয়। এই পথটিই তাকে বুঝিয়েছে, রাষ্ট্রের রাজনীতি আসলে মানুষের উঠোন থেকেই শুরু হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ থেকে তিনি আজ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দলটির অন্যতম প্রধান মুখ। ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মধ্য দিয়েও তিনি দলটির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখেন।

২০২৬ সালের নির্বাচনে আবার ঠাকুরগাঁও-১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন।এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার পর তিনি বিএনপির সব দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এখানেই তার জীবনের এক আশ্চর্য বাঁক। যে মানুষটি একদিন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে স্থানীয় মানুষের কাছে জবাবদিহির রাজনীতি শুরু করেছিলেন, তিনিই আজ সংবিধানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে। তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

একজন শিক্ষক যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন তার কাছে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার কাঠামো হওয়ার কথা নয়; রাষ্ট্র হওয়ার কথা মানুষের জীবন, শিক্ষার সুযোগ, সংস্কৃতির বিকাশ এবং ন্যায়বিচারের একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। এই জায়গাটিই মির্জা ফখরুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

মির্জা ফখরুল ইসলামের ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক ও তুলনামূলকভাবে সংযত রাজনৈতিক প্রকাশভঙ্গি। কবিতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও জনপরিসরে এসেছে। তবে তাকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বা ‘সংস্কৃতিমনা’ হিসেবে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বাস্তব রেকর্ডকেও সামনে রাখতে হবে।

কারণ অসাম্প্রদায়িকতা কেবল কবিতা পাঠের সৌন্দর্যে প্রকাশ পায় না; প্রকাশ পায় মন্দিরে আগুন লাগলে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায়, সংখ্যালঘু নাগরিকের ভয়কে নিজের ভয় হিসেবে অনুভব করার মধ্যে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক না হয়—সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার মধ্যে।

একজন রাষ্ট্রপতির অসাম্প্রদায়িকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—তিনি কি মুসলমানের রাষ্ট্রপতি হবেন, হিন্দুর রাষ্ট্রপতি হবেন, বৌদ্ধের রাষ্ট্রপতি হবেন, খ্রিস্টানের রাষ্ট্রপতি হবেন, নাকি কেবল ‘বাংলাদেশি নাগরিকের রাষ্ট্রপতি’ হবেন? বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনায় উত্তরটি স্পষ্ট—রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের পরিচয় একটাই : নাগরিক। মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি বঙ্গভবন থেকে এই সত্যকে শুধু বক্তৃতায় নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে সেটিই।

একটি জাতির সংস্কৃতি যত মুক্ত, তার মনন তত গভীর।

যে দেশে কবিতা ভয় পায়, গান অনুমতির অপেক্ষায় থাকে, নাটক প্রশ্ন করতে ভয় পায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মত প্রকাশে সংকুচিত হন, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করলে তাকে শত্রু ভাবা হয়—সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগোলেও মানসিকভাবে মুক্ত হয় না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম একজন শিক্ষক ছিলেন। এই পরিচয় তার জন্য এক বিশেষ নৈতিক দায় তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মুক্তচিন্তার পরীক্ষাগার। সেখানে সরকারপন্থী যেমন কথা বলবে, বিরোধী মতও কথা বলবে। কেউ প্রশংসা করবে, কেউ সমালোচনা করবে। কেউ প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করবে। কেউ নতুন দর্শন হাজির করবে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় আনুগত্যের ক্ষেত্র না বানিয়ে মুক্তবুদ্ধি, গবেষণা, বিতর্ক ও সৃজনশীলতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে পারেন, তাহলে তার শিক্ষকসত্তা সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রনায়কসত্তায় পরিণত হবে। একজন শিক্ষক যখন রাষ্ট্রপতি হন, তখন দেশের শিক্ষকসমাজের প্রত্যাশাও একটু বেড়ে যায়। তারা দেখতে চান—বঙ্গভবনের মানুষটি কি শ্রেণিকক্ষের স্বাধীনতার ভাষা বুঝবেন?

সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিভাবক হওয়া—সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত সাংবিধানিক ও অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক। কিন্তু বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে উত্তাল দেশে রাষ্ট্রপতির নৈতিক ভূমিকা কখনোই কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ঐক্যের একটি প্রতীক। তাই মির্জা ফখরুল ইসলামের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।

তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব ছিলেন। দলীয় রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সৈনিক হিসেবে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। কিন্তু বঙ্গভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বদলে গেছে।

এখন তাকে প্রশ্ন করতে হবে না—‘কে বিএনপি?’ তাকে প্রশ্ন করতে হবে—‘কে বাংলাদেশ?’ বিএনপির কর্মী যেমন তার নাগরিক, তেমনি জামায়াতের সমর্থক, বামপন্থী, জাতীয় পার্টির সমর্থক, দলহীন মানুষ, সংখ্যালঘু, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, ব্যবসায়ী—সবাই তার রাষ্ট্রের মানুষ। রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় মহত্ত্ব এখানেই—তিনি দলীয় সীমানার ওপরে উঠে রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। যদি তিনি পারেন, তবে বঙ্গভবন হবে কেবল রাষ্ট্রপতির কার্যালয় নয়; হয়ে উঠতে পারে মানুষের আস্থার একটি নৈতিক ঠিকানা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি নতুন অধ্যায় নয়; এটি কোটি মানুষের প্রত্যাশারও একটি নতুন দরজা খুলেছে। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির কাছে অনেক কিছু চেয়েছে। কেউ চেয়েছে নিরাপত্তা, কেউ ন্যায়বিচার, কেউ সম্মান; কেউ চেয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কেউ চেয়েছে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।

কেউ চেয়েছে সন্তান যেন দলীয় পরিচয়ের কারণে নয়, মেধার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পায়; কেউ চেয়েছে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য; শ্রমিক চেয়েছে নিরাপদ কর্মপরিবেশ; তরুণ চেয়েছে কর্মসংস্থান; নারী চেয়েছে নিরাপত্তা ও মর্যাদা; সংখ্যালঘু নাগরিক চেয়েছে ভয়হীন জীবন। রাষ্ট্রপতির কাছে মানুষের প্রত্যাশা তাই সরাসরি উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র বদলে যাওয়ার প্রত্যাশা।

মানুষ চায়—আইনের চোখ যেন সবার জন্য সমান হয়। মানুষ চায়—ক্ষমতাবান অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে আশ্রয় না পায়। মানুষ চায়—বিরোধী মত যেন রাষ্ট্রদ্রোহের সমার্থক না হয়। মানুষ চায়—সাংবাদিক যেন সত্য বলার জন্য আতঙ্কিত না হন। মানুষ চায়—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেন গবেষণা ও মতপ্রকাশের জন্য কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশংসাপত্র বহন করতে বাধ্য না হন।

মানুষ চায়—শিক্ষার্থী যেন প্রশ্ন করতে পারে, বিতর্ক করতে পারে, ভুল করতে পারে, আবার শিখে উঠতে পারে। মানুষ চায়—ধর্ম যেন মানুষের আত্মার আশ্রয় হয়, রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র না হয়। মানুষ চায়—মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা—সব উপাসনালয়ে মানুষ নিরাপদে প্রার্থনা করতে পারুক। মানুষ চায়—কবি কবিতা লিখবেন, শিল্পী ছবি আঁকবেন, নাট্যকর্মী নাটক করবেন, চলচ্চিত্রকার প্রশ্ন তুলবেন—রাষ্ট্র তাদের সৃষ্টিশীলতাকে সন্দেহের চোখে দেখবে না।

মানুষ চায়—প্রশাসন হবে জনগণের সেবক, শাসক নয়। আর সবচেয়ে বেশি মানুষ চায়—রাষ্ট্র যেন আর কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য এ প্রত্যাশাগুলো হয়তো একেকটি কঠিন আয়না। সেই আয়নায় তাকে শুধু নিজের মুখ নয়, বাংলাদেশের মানুষের মুখ দেখতে হবে।

মির্জা ফখরুল ইসলামকে অনেকে পরিচ্ছন্ন, ভদ্র ও সংযত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক ও মামলা-মোকদ্দমা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন—এমন দাবি অবশ্য ইতিহাসসম্মত হবে না। বাংলাদেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক নেতার মতো তার জীবনেও সংঘাত, মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক বিতর্ক এসেছে। কিন্তু ‘পরিষ্কার রাজনীতি’র অর্থ কেবল মামলা না থাকা নয়।

পরিষ্কার রাজনীতির অর্থ হলো—ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন না করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করা, ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে না দেখা, নিজের দলের ভুলকেও ভুল বলতে পারা এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত না করা।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সামনে তাই নিজের রাজনৈতিক অতীতকে অতিক্রম করার একটি বিরল সুযোগ এসেছে। তিনি চাইলে প্রমাণ করতে পারেন—দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতির পরও একজন মানুষ রাষ্ট্রীয় পদে এসে রাষ্ট্রের হয়ে কথা বলতে পারেন। জনগণ হয়তো তার কাছে আরেকটি জিনিসও প্রত্যাশা করবে—ক্ষমতার প্রতি তার যেন মোহ না জন্মায়। কারণ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রনায়ক তারা নন, যারা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে ছিলেন; বরং তারা, যারা ক্ষমতার চেয়েও রাষ্ট্র ও জনগণকে বড় করে দেখেছিলেন। একটি জাতি যখন অভিভাবক খোঁজে

একটি জাতি যখন দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা পেরিয়ে আসে, তখন মানুষ শুধু শাসক চায় না; একজন অভিভাবক চায়। অভিভাবক মানে এমন কেউ, যিনি দুর্বলকে রক্ষা করবেন, শক্তিমানকে সংযত করবেন, অন্যায় দেখলে নীরব থাকবেন না এবং নিজের মানুষকে ভুল করলেও সত্যের পথ দেখাবেন।

অভিভাবক মানে সবার মাথার ওপর ছায়া—কেবল নিজের পরিবারের নয়। বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন রাষ্ট্রকে নতুন করে আস্থা অর্জন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করতে হবে। সংস্কৃতিকে উন্মুক্ত করতে হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতিকে দৃঢ় করতে হবে। নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। এই কাজে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু নৈতিক প্রভাবের সীমা অনেক বড়। মির্জা ফখরুল ইসলাম সেই নৈতিক শক্তি অর্জন করতে পারবেন কি না—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

২০ আগস্ট ২০২৬-এ তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন; রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়ের নতুন সূচনা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম।

রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত সাংবিধানিক ও অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক। কিন্তু বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে উত্তাল দেশে রাষ্ট্রপতির নৈতিক ভূমিকা কখনোই কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ঐক্যের একটি প্রতীক।

ইতিহাস কাউকে শুধু তার পদ দিয়ে বিচার করে না। ইতিহাস দেখে—পদে বসে তিনি কী করেছেন।

বঙ্গভবনের সাদা দেয়াল একদিন তার রাজনৈতিক বক্তৃতার শব্দ ভুলে যাবে। তার ছবিও একসময় রাষ্ট্রপতিদের সারিতে আরেকটি ছবি হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি তার সময়ে কোনো মন্দিরের ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ নিরাপদ বোধ করে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন, কোনো কবি রাষ্ট্রের ভয় ছাড়া কবিতা লিখতে পারেন, কোনো শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারেন, কোনো বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী নিজের মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন—তাহলে তার রাষ্ট্রপতিত্ব মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।

রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ কোনো পাথরের মূর্তি নয়। মানুষের আস্থা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনকে এক বাক্যে বলা যায়—শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ থেকে রাজনীতির রাজপথ, পৌরসভা থেকে সংসদ, সংসদ থেকে মন্ত্রিসভা, দলীয় নেতৃত্ব থেকে বঙ্গভবন। এই দীর্ঘ যাত্রা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে—পরাজয়, সংগ্রাম, কারাবাস, আন্দোলন, ক্ষমতা, ক্ষমতাচ্যুতি, মানুষের ভালোবাসা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা।

এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা নেওয়ার সময়। তিনি কি পারবেন দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে? তিনি কি পারবেন ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক হতে? তিনি কি পারবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা মুক্তচিন্তার জন্য আরও উন্মুক্ত করতে? তিনি কি পারবেন কবিতা, গান, নাটক, সাহিত্য ও শিল্পকে রাষ্ট্রীয় ভয়ের বাইরে একটি স্বাধীন আকাশ দিতে? তিনি কি পারবেন বিরোধী মতকে শত্রু না ভেবে গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে?

তিনি কি পারবেন কৃষক-শ্রমিক-শিক্ষক-সাংবাদিক-শিল্পী-ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী-প্রবাসী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের রাষ্ট্রপতি হতে? আর সবচেয়ে বড় কথা—তিনি কি পারবেন এমন একজন অভিভাবক হতে, যার কাছে বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে আশ্রয় পাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ইতিহাসের কিছু প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতায় লেখা থাকে না—সময় লিখে দেয়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে এখন সেই সময়। ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি থেকে উঠে আসা একজন শিক্ষক-কবি-রাজনীতিক আজ বঙ্গভবনের বাসিন্দা। তার হাতে এখন রাষ্ট্রের প্রতীকী অভিভাবকত্বের দায়িত্ব। তিনি চাইলে এই পদকে কেবল একটি সাংবিধানিক আসন হিসেবে পালন করতে পারেন। আবার চাইলে এটিকে মানুষের আস্থার এক নৈতিক আশ্রয়ে পরিণত করতে পারেন।

বাংলাদেশ আজ তার কাছে ক্ষমতার প্রদর্শন চায় না। চায় সংযম। প্রতিহিংসা চায় না। চায় ক্ষমা। ভয় চায় না। চায় স্বাধীনতা। বিভাজন চায় না। চায় সম্প্রীতি। আর সর্বোপরি—একজন এমন রাষ্ট্রপতি চায়, যিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বলতে পারবেন—

‘আমি শুধু একটি দলের নই; আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। এই দেশের প্রতিটি মানুষ আমার আপন।’

সেদিন হয়তো বঙ্গভবনের সাদা দেয়াল শুধু একজন রাষ্ট্রপতির বাসভবন থাকবে না; হয়ে উঠবে একটি অসাম্প্রদায়িক, মুক্তচিন্তাশীল ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রতীক। আর তখনই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি লেখা হবে—ক্ষমতার ইতিহাসে নয়, মানুষের হৃদয়ে। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণ কোনো রাষ্ট্রপতির কাছে অলৌকিক কিছু চায় না।

তারা শুধু চায়—রাষ্ট্র যেন তাদের ভয় না দেখায়, আইন যেন তাদের সঙ্গে বৈষম্য না করে, ভিন্নমত যেন তাদের অপরাধী না বানায়, ধর্ম যেন তাদের বিভক্ত না করে, সংস্কৃতি যেন তাদের শ্বাসরুদ্ধ না করে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে বসা মানুষটি যেন সংকটের দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস রাখেন। বঙ্গভবনের দরজা মির্জা ফখরুলের জন্য খুলেছে; এখন সময় মানুষের হৃদয়ের দরজা খোলার। সেই দরজা খুলবে কি না—তার চাবি তার হাতেই।

 

 

লেখক : উপাচার্যনওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।

জা ই/ এনজি