রাত ৯:৩৭ | শুক্রবার | ৭ আগস্ট, ২০২৬ | ২৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩, বর্ষাকাল | ২৩ সফর, ১৪৪৮

৩৬ জুলাই নাকি ৫ আগস্ট : ইতিহাসের ক্যালেন্ডার ও জনস্মৃতির রাজনীতি

মতামত

ইতিহাসের নিজস্ব একটি ক্যালেন্ডার আছে, আবার মানুষের স্মৃতিরও একটি আলাদা ক্যালেন্ডার থাকে। রাষ্ট্র ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে সরকারি নথি, দলিল ও নির্দিষ্ট তারিখের মাধ্যমে; অন্যদিকে জনগণ ইতিহাসকে ধারণ করে প্রতীক, ভাষা, স্লোগান ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

ক্যালেন্ডারের ভাষায় জুলাই মাসের ৩৬ তারিখ বলে কোনো দিন নেই। ফলে ইতিহাস, গবেষণা, আদালতের নথি কিংবা রাষ্ট্রের সরকারি দলিলে ঘটনাবলি অবশ্যই ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখেই স্থান পাবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে আন্দোলনের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া ‘৩৬ জুলাই’ একটি প্রতীকী অভিব্যক্তি হিসেবে জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে।

এর মাধ্যমে অনেক মানুষ বোঝাতে চেয়েছেন যে আন্দোলনের সেই সময়কাল ছিল একটি দীর্ঘায়িত জুলাই—যেখানে ক্যালেন্ডারের হিসাবের চেয়ে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এসব প্রতীকের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন সবসময় গবেষণা, তথ্য ও বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে হওয়া উচিত। কোনো প্রতীককে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা যেমন ইতিহাসকে সংকুচিত করে, তেমনি জনগণের স্মৃতিতে গড়ে ওঠা প্রতীককে সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না।

ইতিহাসের বাস্তবতা হলো, কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন একদিনে ঘটে না। প্রতিটি আন্দোলনেরই থাকে প্রস্তুতির সময়, উত্তরণের সময় এবং পরিণতির সময়।

তবে ইতিহাসের বাস্তবতা হলো, কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন একদিনে ঘটে না। প্রতিটি আন্দোলনেরই থাকে প্রস্তুতির সময়, উত্তরণের সময় এবং পরিণতির সময়। তাই একটি নির্দিষ্ট দিনকে পুরো আন্দোলনের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দেখা ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে সরলীকৃত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জনআকাঙ্ক্ষা ও জনমতের গুরুত্বকে কখনো অবমূল্যায়ন করা যায় না। রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলীয় পরিচয় কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নাগরিক।

যখন জনগণ তাদের মতামত, প্রত্যাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করে, তখন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার কাজ সেই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধানের পথ খোঁজা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সংলাপ, জবাবদিহি এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিকে শক্তিশালী করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘৩৬ জুলাই’ কি ভবিষ্যতের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে উঠবে? এর উত্তর আজ নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়।

ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সেই শিক্ষা, আত্মসমালোচনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মধ্যে, যা একটি জাতিকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

ইতিহাসের অনেক প্রতীক সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রতীক প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থেকেছে। একটি প্রতীকের স্থায়িত্ব নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যবহার, শিক্ষাব্যবস্থায় তার উপস্থাপন, গবেষকদের মূল্যায়ন, গণমাধ্যমের ভাষ্য এবং সর্বোপরি জনগণের সম্মিলিত স্মৃতির ওপর।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতা ও সম্পাদকীয় লেখার কাজ কোনো রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং তথ্য, প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের মাধ্যমে পাঠককে চিন্তার সুযোগ করে দেওয়া।

সম্পাদকীয় কলামের শক্তি তার ভারসাম্য, যুক্তি এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে। আবেগ ইতিহাসের অংশ হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের মূল্যায়ন হতে হবে তথ্যনির্ভর।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন ব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বিস্তৃত জনআলোচনা চলছে।

এই বাস্তবতায় অতীতের ঘটনাগুলো কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার না করে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করাই হবে অধিক ফলপ্রসূ। একটি পরিণত গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো—সেখানে ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান বজায় থাকে।

সময়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে মানুষের স্মৃতিতে কোন নামটি বেশি স্থায়ী হবে—৫ আগস্ট, নাকি ‘৩৬ জুলাই’। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ইতিহাসের শক্তি কোনো একটি তারিখে সীমাবদ্ধ নয়; ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সেই শিক্ষা, আত্মসমালোচনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মধ্যে, যা একটি জাতিকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

ক্যালেন্ডার একটা দিনকে চিহ্নিত করে, কিন্তু একটি জাতির বিবেক নির্ধারণ করে সেই দিনের অর্থ। আর সেই অর্থ নির্মাণের দায়িত্ব রাষ্ট্র, রাজনীতি, গণমাধ্যম, গবেষক এবং সচেতন নাগরিক-সবার।

 

 

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ

জা ই / এনজি