রাত ১২:০৮ | বৃহস্পতিবার | ৯ জুলাই, ২০২৬ | ২৫ আষাঢ়, ১৪৩৩, বর্ষাকাল | ২৩ মহর্‌রম, ১৪৪৮

পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে আর্জেন্টিনার বিতর্কিত রূপকথার জয়

একেবারে খাদের কিনারায় ছিল আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা প্রায় শেষ হতে বসেছিল। তবে শেষ রক্ষা হয়েছে। মেসির পেনাল্টি মিসের পর মিশর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। ম্যাচের দ্বিতীয় অর্ধের ৩৪ মিনিট পর্যন্ত তারাই জয়ী হওয়ার দৌড়ে ছিল। তবে মেসি তার শেষ বিশ্বকাপ ‘ট্যাঙ্গো’ এত দ্রুত শেষ করতে চাননি। শেষ দিকে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে তিনি দলকে এক ঐতিহাসিক জয় এনে দেন। ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোলটি করে ব্যবধান ৩-২ করেন এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেন। সেখানে তারা সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে।

Egyptian goalkeeper Mostafa Shoubir, number 23, saves a penalty kick from Argentine striker Lionel Messi, number 10, during the 2026 World Cup Round of 16 match between Argentina and Egypt — Photo: ODD ANDERSEN / AFP

অপরদিকে মিশরীয় দল ম্যাচের শুরুটা বেশ ভালো করে। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ওপর তারা শুরু থেকেই চড়াও হয়ে খেলতে থাকে এবং ম্যাচের প্রথমার্ধের ১৪ মিনিটেই এর ফল পেয়ে যায়। একটি চমৎকার কর্নার কিক থেকে আসা বলে ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়ে হেড করে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন।

২০১৮ সালে ফ্রান্সের কাছে শেষ ষোলোতে হেরে বিদায় নেওয়ার পর এই প্রথম আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে। স্কালোনির দলের সামনে এটি ছিল এক নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে চার মিনিট পরেই তারা সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায়। হাসান বক্সের ভেতর তাগলিয়াফিকোকে ফাউল করায় পেনাল্টির বাঁশি বাজে।

কিন্তু মেসি পেনাল্টি নিতে এগিয়ে এসে আবারও মিস করেন। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার চতুর্থ পেনাল্টি মিস এবং এই আসরে দ্বিতীয়। তাতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নেতিবাচক রেকর্ডে নাম লেখান। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করেন তিনি।

Ziko celebrates Egypt's second goal of the match, this time with no chance of being disallowed — Photo: Buda Mendes/Getty Images via AFP

পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে নেয় আর্জেন্টিনা। ছয় জনের ব্যাকলাইন নিয়ে গড়া মিশরের শক্ত রক্ষণভাগের বিপক্ষে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখে তারা। আর্জেন্টাইনদের কৌশল ছিল মাঝমাঠ দিয়ে খেলা তৈরি করা। বাম প্রান্তে তাগলিয়াফিকোকে ব্যবহার করে খেলা পরিবর্তন করতে চেয়েছিল তারা। প্রথমার্ধে তারা সমতা আনার বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর অসাধারণ কিছু সেভের কারণে গোল পায়নি। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিটে তিনিই ছিলেন মাঠের সেরা খেলোয়াড়।

কিন্তু মিশর ঠিকই পাল্টা আক্রমণকে কাজে লাগানোর পথ খুঁজে নেয়। ২১ মিনিটে আর্জেন্টিনার একটি কর্নার কিকের পর হাসান চমৎকার একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ভেঙে দেন। তারপর ফাঁকায় থাকা জিকোকে খুঁজে নেন। এবার গোল করে ব্যবধান বাড়াতে কোনো ভুল হয়নি। এর মাধ্যমে দলটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার পথে অনেকটাই এগিয়ে যায়।

Messi celebrates his 21st World Cup goal, which secured a draw for Argentina against Egypt — Photo: Elsa/Getty Images via AFP

ম্যাচের শেষ দিকে সমতা ফেরানোর জন্য আর্জেন্টিনার সামনে যেন এক ‘পাহাড়সম’ চ্যালেঞ্জ ছিল। তারা আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করে। মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে রোমেরোর চমৎকার হেডের মাধ্যমে ব্যবধান কমায়। এর কিছুক্ষণ পরেই ১০ নম্বর জার্সিধারী আরেকটি দুর্দান্ত একক আক্রমণ থেকে লাউতারোকে খুঁজে নেন। কিন্তু তার হেড লক্ষ্যের বাইরে চলে যায়।

মেসি হাল ছাড়েননি। তিনি নিজে দায়িত্ব নেন। এর কিছুক্ষণ পরেই ডি বক্সের ভেতর একটি আলগা বল পেয়ে গোল করে স্কোরলাইনে সমতা আনেন। এটি ছিল চলতি আসরে তার অষ্টম গোল এবং সব বিশ্বকাপ মিলিয়ে ২১তম গোল।

ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে মিশর একটি আক্রমণ চালায়। কিন্তু সালাহ বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পায়। লাউতারো উইংয়ে বল পেয়ে বক্সে থাকা এনজোর উদ্দেশ্যে নিখুঁত একটি ক্রস বাড়ান। ইনজুরি টাইমে এনজো গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন। গোল উদযাপনের সময় তিনি তার জার্সিতে থাকা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ব্যাজটির দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখান। মাত্র ১৩ মিনিটের ব্যবধানে ৩টি গোল! আর এর মাধ্যমেই টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের দৌড়ে আর্জেন্টিনা টিকে রইল। এবং বিশ্বকাপে রূপকথার গল্প লেখার কলম ধরে রাখলেন।

 

 

জা ই/ এনজি