রাত ১১:৩২ | বুধবার | ৩ জুন, ২০২৬ | ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩, গ্রীষ্মকাল | ১৬ জিলহজ, ১৪৪৭

জিয়াউর রহমান ছিলেন শতাব্দীর অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা : অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩ জুন, ২০২৬

 

 

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন শতাব্দীর অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, ছিলেন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ও জাতি গঠনের কারিগর। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, কৃষি ও অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে—তাঁর অবদান ছিল অনন্য।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ।

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সামরিক বাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তার হাতে জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন।  তিনি বলেন, ‘তাঁকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি সততা, সাহস, বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা ও গভীর দেশপ্রেম দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।’

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, ইতিহাসে জাতীয়তাবাদী নেতাদের প্রায়ই সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, আলজেরিয়ার আহমেদ বেন বেল্লা, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ কিংবা লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো নেতারাও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। কারণ জাতীয়তাবাদী নেতারা নিজেদের দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে তুলে ধরেন।’

তিনি মনে করেন, জিয়াউর রহমানও একই ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দাবি করেন, ১৯৮১ সালে তাঁর শাহাদাতের আগে দেশে নানা ধরনের রাজনৈতিক প্রচারণা সংঘঠিত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তাঁর দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আজমের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ‘সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কমিটি’ গঠন— এসবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, একই সময়ে সেনাবাহিনীর ভেতরেও গোপনে প্রচারণা চালানো হয় যে জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের বদলে পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তিনি বলেন ‘এসব প্রচারণার মূল লক্ষ্য ছিল তাঁর দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করা।’

ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দলীয় কোন্দল নিরসনের উদ্দেশ্যে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। যদিও তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান তাঁকে সফরটি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন, তারপরও তিনি সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর দেশের মানুষ যখন হতভম্ব ও দিশেহারা, তখন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি জাতিকে নতুন সাহস ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলেন।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘তিনি তখন একজন মেজর। দেশের সাধারণ মানুষ তাঁকে চিনত না। কিন্তু সেই ঘোষণার মধ্য দিয়েই তিনি মুহূর্তে ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মানুষ বুঝতে পারে— লড়াই শুরু হয়েছে, এই দেশ একদিন স্বাধীন হবে।’

তার মতে, ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই দেখা যায়, যেখানে একজন প্রায় অচেনা সামরিক কর্মকর্তা সংকটকালে একটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতির আশা ও প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হন।

তিনি বলেন, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান বীরত্বের সঙ্গে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধশেষে তিনি আবার সৈনিক জীবনে ফিরে যান। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটে আবারও তাঁকে জাতির সামনে দাঁড়াতে হয়।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সৈনিকরা তাঁকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।’

তিনি বলেন, সে সময় অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে জিয়াউর রহমান বিদেশি আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করেননি। তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে সেনাবাহিনীর তোষাখানায় একটি রিভলভার জমা দিয়ে তিনি প্রতীকীভাবে জাতিকে বার্তা দিয়েছিলেন যে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি আপসহীন।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘৭ নভেম্বরের পরই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু তাঁর এই উত্থান এবং জাতীয়তাবাদী চরিত্রই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।’

সাক্ষাৎকারে তিনি জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক অবদানের কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে— কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়। তিনি বলেন’ ‘এই তিনটি ক্ষেত্রের ভিত শক্তিশালী করার পেছনে জিয়াউর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।’

তার ভাষায়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষিকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, উন্নত বীজ ও সার সরবরাহ, চাষের নিবিড়তা বাড়ানো এবং কৃষকদের সংগঠিত করার মতো উদ্যোগ তিনি হাতে নেন।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, কৃষকের ঘরে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গ্রাম বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে খাদ্য উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। শাকসবজি, ফল, ফুল ও হাঁস-মুরগির উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘এই ধারার সূচনা করেছিলেন জিয়াউর রহমান,’ এমন মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পোশাকশিল্পের কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। পাশাপাশি শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে তিনি এ খাতের বিকাশের পথ সুগম করেন।

তিনি বলেন ‘রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তুলতে তিনি যে নীতিগুলো গ্রহণ করেছিলেন, সেগুলো ছিল অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী। আজ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্পখাত।’

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের অবদান উল্লেখ করে প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি বাংলাদেশি শ্রমশক্তির জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আজ দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের যে বিশাল ভূমিকা, তার ভিত্তিও গড়ে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।’

গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন সামরিক কর্মকর্তা হয়েও জিয়াউর রহমান জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘তিনি চাইলে সামরিক শাসক হয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি। বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন, নির্বাচন দেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন।’

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি দেশের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে কখনো দ্বিধা করতেন না। তিনি বলেন ‘রাষ্ট্রনায়কেরা সাধারণ নেতাদের মতো নন। তাদের দূরদর্শিতা, চিন্তার গভীরতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তা আলাদা হয়। জিয়াউর রহমান ছিলেন তেমনই একজন নেতা।’

 

রা ই / এনজি