তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবার আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড় নিয়েছে। বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র নির্দেশনার বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই হাইকোর্টে রিট দায়েরের অভিযোগ উঠেছে খোদ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান তাহমিনা আফরোজের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, এ বিষয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটির (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন কোম্পানির তিন পরিচালক মো. আবুল হাসেম, মো. হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী ও মো. আবুল হাসেম। অভিযোগে বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদকে না জানিয়ে চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে হাইকোর্টে রিট দায়েরের জন্য অনুমোদনপত্র (অথরাইজেশন লেটার) ইস্যু করেছেন। অথচ এ বিষয়ে কোনো বোর্ড সভায় আলোচনা বা অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
ওই নির্দেশনায় অনিয়মের মাধ্যমে বিজয়ী ঘোষিত পাঁচ পরিচালক এ বি এম কায়কোবাদ, মো. মাসুদুর রহমান, তাহমিনা আফরোজ, জিয়াউদ্দিন পোদ্দার ও মো. সাইফুল ইসলামের পরিবর্তে প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত মো. মফিজ উদ্দিন, ফারজানা রহমান, আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, নাফিসা সালমা ও মো. ওসমান গণিকে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী পরিচালকদের দাবি, আইডিআরএ’র ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন নম্বর-২৮৬/২০২৬ দায়ের করা হয়েছে কোম্পানির পক্ষ থেকে। তবে রিট দায়েরের আগে বিষয়টি কখনও বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি রিটে ব্যবহৃত ক্ষমতাপত্রে বোর্ড অনুমোদনের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচালকদের অভিযোগ, পরিচালক নির্বাচন সংক্রান্ত আইনজীবীদের মতামত, নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদন এবং আইডিআরএ’র গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্রও পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হয়নি। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও কোম্পানি সচিবও এ বিষয়ে বোর্ডকে অন্ধকারে রেখেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী বলেন, ‘একটি বিষয়ে রিট করতে হলে বোর্ডে অনুমোদন নিতে হয়; কিন্তু এ বিষয়ে কোনো আলোচনা না করেই হাইকোর্টে রিট দায়ের করে দিয়েছেন চেয়ারম্যান। এটা কি তিনি করতে পারেন? বিষয়টি আমরা নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে জানিয়েছি। আশা করছি আইডিআরএ একটি সঠিক সমাধান দেবে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান তাহমিনা আফরোজের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাদের সংখ্যা প্রায় ৯ জন। ফলে পর্ষদে একক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গোপনে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি পরিচালকদের।
তাদের অভিযোগ, এসব সিদ্ধান্তের অনেকগুলোই কোম্পানির স্বার্থের পরিপন্থী। এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি ও করপোরেট সুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিতে পড়ছে গ্রাহকদের বিনিয়োগ ও আমানতের নিরাপত্তা।
কোম্পানির কয়েকজন পরিচালক মনে করছেন, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে স্বচ্ছতা ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। তবে তারা আইডিআরএ’র তদন্ত প্রতিবেদন ও নির্দেশনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন এবং চলমান রিট মামলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পরিচালক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়; বরং দেশের বিমা খাতে করপোরেট ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তাই নিয়ন্ত্রণ সংস্থার উচিত সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।





