দুপুর ২:৩৮ | বুধবার | ৬ মে, ২০২৬ | ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩, গ্রীষ্মকাল | ১৮ জিলকদ, ১৪৪৭

সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

বৈশাখের তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গতিশীলতা ব্যাহত হওয়ায় গ্রামীণ জনপদসহ শহর অঞ্চল ঘন ঘন ও দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মূলত আমদানিকৃত গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোর সরবরাহ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হ্রাস পেয়েছে। তবে এই তাপপ্রবাহের মাঝেও খুশির তাপ ছড়িয়েছে মার্চ মাসের শেষ নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তি যুগে প্রবেশ করেছে পারমাণবিক জ্বালানি প্রথম ইউনিটে লোড করার দ্বারা। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩৩তম।

এই কেন্দ্রটি বাংলাদেশের স্বল্প-কার্বন জ্বালানি দ্বারা ২,৪০০ মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য বেস-লোড বিদ্যুৎ সরবরাহ উৎপাদন করবে, যা জাতীয় চাহিদার প্রায় ১০-১২ শতাংশ মেটাতে সক্ষম হবে।

যদিও প্ল্যান্টটি পরিচালনার দিক থেকে কার্বনমুক্ত, তবে পদ্মা নদীতে জল নিষ্কাশনের তাপীয় প্রভাব এবং দূষণ জলজ জীবন ও মাছের সংখ্যার ওপর প্রভাব ফেলবে বলে পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি পর্ব শেষে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশ তালিকা থেকে উত্তরণের কথা থাকলেও বর্তমান সরকার ইউএনসিডিপি’র চেয়ারম্যানকে প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে আরও সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে একটি চিঠি পাঠিয়ে প্রস্তুতি পর্ব ২৪ নভেম্বর, ২০২৯ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে।

এর প্রেক্ষিতে ইউএনসিডিপি ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের অনুরোধের ওপর একটি গণশুনানির আহ্বান জানিয়েছে। শুনানির পর, কমিটি জুন মাসে জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে তাদের সুপারিশ জমা দেবে।

এরপর জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ তাদের মূল্যায়ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠাবে, যার অধিবেশন সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। স্থগিতাদেশের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভোটের মাধ্যমে নেওয়া হবে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একটি ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে, ‘উত্তরণ অনিবার্য’। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কাঠামোগত পরিবর্তন এবং সামাজিক উন্নতি–উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা থেকে শুরু করে রপ্তানিমুখী শিল্পের সম্প্রসারণের এক অনন্য উদাহরণ।

স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণ তিনটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডে দেশটির কর্মক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানব সম্পদ সূচক, এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক। এ উত্তরণের জন্য একটি দেশকে পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এই সূচকগুলোর মধ্যে অন্তত দুটিতে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।

বর্তমানে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত ১৬টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে, বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডের সবকটিতেই যোগ্যতা অর্জন করার গৌরব অর্জন করেছে। একই আয়তন ও জনসংখ্যার খুব কম দেশই এমন উত্তরণ ঘটিয়েছে এবং সেই দিক থেকে বাংলাদেশের এই উত্তরণ অসামান্য।

যদি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের তিন বছরের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন গৃহীত না হয় (যদিও মার্চ মাসে জাতিসংঘের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরণের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের এখনো গুরুতর ঘাটতি রয়েছে, কারণ দেশটির অর্থনীতি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ধাক্কায় প্রভাবিত হচ্ছে) উত্তরণের পর এই দায়িত্বগুলোর জন্য দেশটি আদৌ কি প্রস্তুত? এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া মোটেও সুখকর নয়। আমরা আজও কেন পারলাম না প্রস্তুত হতে তার কারণ ও প্রতিকার খোঁজা জরুরি।

বাস্তবতা হলো, এই উত্তরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক বা সামাজিক সুবিধা বয়ে আনবে না বরং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে বিশেষ সুবিধা আর থাকবে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সহায়তার উষ্ণ চাদরটি আর থাকবে না।

নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ বাংলাদেশকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলতে বাধ্য। বর্তমান অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা বিবেচনা করে ২০২৬ সালের নভেম্বর মাস উত্তরণের জন্য নয় কারণ উত্তরণই লক্ষ্য নয়।

কেননা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’-এর পরিবর্তে ‘জেনারেলাইজড স্কিম অফ প্রেফারেন্সেস প্লাস’ প্রকল্পে রপ্তানির ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে এছাড়াও জিএসপি প্লাস প্রকল্পে সুশাসন, শ্রম অধিকার এবং পরিবেশগত মানের ওপর শর্ত রয়েছে এবং এই ক্ষেত্রগুলোয় বাংলাদেশের রেকর্ড মিশ্র প্রকৃতির।

এতে বাংলাদেশের রপ্তানি সংকুচিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, যার মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক খাতে সবচেয়ে বড় পতন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও মৎস্য খাতের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও একইভাবে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। তার ওপর বেসরকারি বিনিয়োগ ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে জিডিপির ২২.০৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৬.৫১ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় পরিচালনগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গ্যাসের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে। ২০২২-২৫ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.১ শতাংশ থেকে কমে ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা উত্তরণের গতিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ, ২০২৫-এর জুলাই রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চলাকালীন সময় অর্থনৈতিক চাপের ওপর বর্তমানে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি (খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি: আবাসন, পরিষেবা ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে মার্চ মাসে তা বেড়ে ৯.০৯ শতাংশ), টাকার তীব্র অবমূল্যায়ন এবং হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উচ্চ ঋণের বোঝা, ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক চাকাকে বারবার পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

উপরন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ দারিদ্র্য মোকাবিলা, জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক সূচকের উন্নয়নে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা সমন্বয় করে ২০৩০ এজেন্ডার দিকে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। চরম দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, শিক্ষায় নারী অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও মাতৃমৃত্যুহার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হারে কমেছে।

জলবায়ু কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান বৈপরীত্যের সম্মুখীন হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও সিমেন্ট উৎপাদন থেকে এর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন ক্রমাগত বাড়ছে, সাথে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জলজ জীবন এবং স্থলজ জীবনের আওতায় পরিবেশ চাপ দৃশ্যমান। শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো অগ্রগতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দুর্নীতি সূচকে স্কোরের পতন, ন্যায়বিচার পাওয়ার সীমিত সুযোগ, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিধিনিষেধ—চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এত অনিশ্চয়তার গহ্বরে খুঁজে দেখলে আমাদের সফলতার গল্পও রয়েছে যা বাংলাদেশকে সাহসের সাথে কাজ করে চলতে অনুপ্রাণিত করবে-২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছিল এবং নিম্নআয়ের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ তিন দেশের একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশটি প্রধান সূচকগুলোতে পরিমাপযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

স্বল্পোন্নত দেশে উত্তরণের জন্য সব শর্ত পূরণ করলেও উত্তরণের পরবর্তী পথ মসৃণ করতে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থায়িত্বের লক্ষে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে এবং নীতিগুলো আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে হবে।

খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করে, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৃহত্তর বিনিয়োগ, অন্যদিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোতে দ্রুত অগ্রগতি এখন আর ঐচ্ছিক নয় বরং আবশ্যকীয়। মধ্যপ্রাচ্য সংকটজনিত কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় বিশেষ পদক্ষেপ ও বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে।

 

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

জা ই / এনজি