রাত ৯:১৪ | সোমবার | ১৮ মে, ২০২৬ | ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩, গ্রীষ্মকাল | ৩০ জিলকদ, ১৪৪৭

কলেজ থেকেই হোক উদ্যোক্তা তৈরির শিক্ষা

মতামত

মীর হাসিব মাহমুদ
১৮ মে ২০২৬

 

 

ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিকেলের আড্ডা। কয়েকজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছে। একজন বলছে কানাডার জন্য আইইএলটিএস কোচিং করছে, আরেকজন বলছে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে নিতে তিন বছর পার হয়ে গেছে। পাশেই আরেকজন চুপচাপ বসে আছে। কারণ সে জানে, পরিবারের হাজার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও এখনো বুঝে উঠতে পারেনি এই ডিগ্রি দিয়ে আসলে কী করবে।

এই দৃশ্য আজ শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; পুরো বাংলাদেশের বাস্তবতা। দেশের হাজার হাজার তরুণ আজ শিক্ষিত, কিন্তু অনিশ্চিত। ডিগ্রি আছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেই। স্বপ্ন আছে, কিন্তু পথ নেই। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, যে তরুণদের ওপর ভর করে বাংলাদেশ আগামী অর্থনীতি গড়বে বলে আশা করছে, তাদের একটি বড় অংশ আজ দেশ ছাড়ার সুযোগ খুঁজছে।

অন্যদিকে দেশের শিল্পখাত, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আবার উল্টো অভিযোগ করছে যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির সংকটও বাড়ছে। এই বৈপরীত্যই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটগুলোর একটি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে কর্মহীন থাকছে। গবেষণা সংস্থা সিপিডি এবং শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো?

কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মূলত পরীক্ষাভিত্তিক। একজন শিক্ষার্থীকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হয়, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই শেখানো হয় কীভাবে বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান করতে হয়। ফলে চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেও অনেক শিক্ষার্থী জানে না কীভাবে একটি পেশাদার সিভি তৈরি করতে হয়, কীভাবে ইন্টারভিউতে কথা বলতে হয় কিংবা কীভাবে একটি বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান করতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো কারিকুলাম পড়ানো হচ্ছে, অথচ বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং ও সাইবার নিরাপত্তা কিংবা উদ্যোক্তা বিষয়ক দক্ষতা এখন বিশ্ববাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো সেই বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।

এই কারণেই দেশে চাকরি থাকলেও দক্ষ মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান প্রায়ই অভিযোগ করে যে তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতার কর্মী খুঁজে পায় না। বিশেষ করে প্রযুক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, আধুনিক বিপণন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজিটাল অপারেশন এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। অথচ প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করছে।

সমস্যা আসলে শিক্ষার্থীদের মেধার নয়; সমস্যা হচ্ছে প্রস্তুতির। বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণকে এমন একটি কাঠামোর মধ্যে বড় করা হচ্ছে যেখানে চাকরি পাওয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্য। ফলে তারা চাকরি খোঁজার জন্য প্রস্তুত হয়, কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি করার জন্য নয়। এই মানসিকতার কারণে শিক্ষিত বেকারত্ব আরও ভয়াবহ হচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিবারগুলোয় এখনো একটি প্রচলিত ধারণা আছে, ভালো চাকরি মানেই সফলতা। ফলে একজন তরুণ যদি ব্যবসা শুরু করতে চায়, অনেক পরিবারই সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখে। অথচ বাস্তবতা হলো, শুধু চাকরির ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সরকার কিংবা বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান একা কখনোই লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে না।

এ কারণেই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উদ্যোক্তা মানসিকতা তৈরি করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং বাস্তবমুখী কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি ছোটবেলা থেকেই সমস্যা চিহ্নিত করা, দল পরিচালনা করা, আর্থিক পরিকল্পনা করা কিংবা ছোট উদ্যোগ পরিচালনার অভিজ্ঞতা পায়, তাহলে সে শুধু চাকরিপ্রার্থী হয়ে উঠবে না; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারীও হতে পারে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এখন শিক্ষার্থীদের ‘জব সিকার’ নয়, ‘প্রবলেম সলভার’ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। কারণ ভবিষ্যতের অর্থনীতি শুধু চাকরিনির্ভর হবে না; বরং ইনোভেশন, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা কার্যক্রমের ওপর দাঁড়াবে।

বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

কারণ বর্তমানে যে আরেকটি বড় সংকট তৈরি হচ্ছে, সেটি হলো মেধাপাচার। দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের বড় একটি অংশ বিদেশে চলে যেতে চাচ্ছে। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছে, কেউ চাকরির জন্য, আবার কেউ স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করছে।

কেন?

কারণ তারা দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। যখন একজন তরুণ দেখে দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেও একটি স্থিতিশীল চাকরি পাওয়া কঠিন, যখন দেখে দক্ষতার চেয়ে অনেক সময় পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, যখন দেখে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই তখন সে এমন একটি দেশে যেতে চায় যেখানে তার কাজের মূল্যায়ন হবে।

বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায় যখন তার সেরা মেধাগুলো দেশেই থেকে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন এমন এক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে যেখানে তরুণদের বড় একটি অংশ দেশকে ‘সম্ভাবনার জায়গা’ হিসেবে নয়, বরং ‘ছাড়ার জায়গা’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি খাত, শিল্পখাত কিংবা আধুনিক সেবা খাত সব জায়গাতেই দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। কিন্তু যদি দেশের তরুণরা দক্ষতা অর্জনের আগেই হতাশ হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে অভিযোজন সক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও ডিজিটাল দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা। শুধুমাত্র ডিগ্রি দিয়ে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে অনেক প্রচলিত চাকরির ধরন বদলে দিচ্ছে। যেসব কাজ নিয়মভিত্তিক এবং পুনরাবৃত্তি, সেগুলোর বড় অংশ ভবিষ্যতে অটোমেশন-এর আওতায় চলে যেতে পারে। ফলে আগামী পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে তরুণদের নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বড় একটি অংশ এখনো সেই প্রস্তুতির বাইরে।

এখনো অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বুঝতে পারে না তার কোনো দক্ষতা আছে। অনেকেই জানে না ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে কোন কাজের চাহিদা বাড়বে। কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্যারিয়ার দিকনির্দেশনা অত্যন্ত দুর্বল। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতা, প্রযুক্তি কিংবা উদ্যোক্তা বিষয়ক বাস্তব ধারণা খুব কম দেওয়া হয়। ফলে অনেক তরুণ শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনের দৌড়ে অংশ নেয়, কিন্তু নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করতে পারে না।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই এই সংকট থেকে বের হতে চায়, তাহলে শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করলেই হবে না; নতুন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এমন শিক্ষা, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। এমন শিক্ষা, যা একজন তরুণকে চাকরি খোঁজার পাশাপাশি নতুন কাজ তৈরি করার সাহসও দেবে।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উদ্যোক্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের বাস্তব ব্যবসায়িক প্রজেক্টে যুক্ত করা যেতে পারে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার ও উদ্ভাবন গবেষণাগার এবং ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। একজন উদ্যোক্তা, একজন উদ্ভাবক কিংবা একজন ফ্রিল্যান্সারও দেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ এই বাস্তবতা পরিবার ও সমাজকে বুঝতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শুধু চাকরিপ্রার্থীদের দিয়ে গড়ে উঠবে না; গড়ে উঠবে দক্ষ, সৃজনশীল ও সাহসী তরুণদের হাত ধরে।

আজকের তরুণরা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষতা এবং সুযোগ পায়, তাহলে তারাই বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যদি আমরা এখনই শিক্ষা, দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে গুরুত্ব না দেই, তাহলে শিক্ষিত বেকারত্ব আরও ভয়াবহ হবে, মেধাপাচার আরও বাড়বে এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়বে।

সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়
mirhasib@lnabd.org

জা ই / এনজি ডেস্ক