
অনেকটা বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছিলেন শেখ হাসিনা! ক্রোধ আর কঠোরতা দিয়েই টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর গদি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেকেনি সাড়ে ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাধ্যমে সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। যদিও জনবিক্ষোভ দমাতে নেওয়া হয়েছিল একের পর এক পরিকল্পনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় নারী-শিশুসহ বহু মানুষ। এমনকি ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে গণভবনে চূড়ান্ত পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। তবে কোনো কৌশলই থামাতে পারেনি রাজপথের জনস্রোত। ৫ আগস্টের জনজোয়ারে চূর্ণ হয়ে যায় ক্ষমতার দম্ভ। আর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়।
ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। তবে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি দমনে ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে ডাকা তার শেষ বৈঠকে কারা ছিলেন, কী নির্দেশ গিয়েছিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে—রাজসাক্ষ্যে এমন বহু অজানা তথ্যের জট খুলেছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের একসময়ের কর্তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি। ফাঁস করেছেন ছাত্র-জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করতে নেওয়া গোপন সব পরিকল্পনার কথাও।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর জবানবন্দি দেন। রাজসাক্ষ্যে নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আন্দোলন দমনে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বর্ণনা দেন তিনি।
চৌধুরী মামুন বলেন, আন্দোলন দমনের কৌশল নির্ধারণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় নিয়মিত বসতো কোর কমিটির বৈঠক। তিনি নিজেও কোর কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) টিপু সুলতান, অতিরিক্ত সচিব রেজা মোস্তাফা, এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবিপ্রধান হারুনুর রশিদ, র্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ, ডিএমপি কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান, বিজিবির ডিজি মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকি, আনসারের ডিজি মেজর জেনারেল একেএম আমিনুল হক, এনটিএমসির ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও ডিজিএফআইয়ের প্রধান উপস্থিত থাকতেন। বৈঠকে আন্দোলন দমন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকের কথাও তুলে ধরেছিলেন নিজের জবানবন্দিতে। প্রস্তাবটি ডিজিএফআই থেকে এসেছিল বলে দাবি করেছেন সাবেক এই আইজিপি।
পরিস্থিতি আরও অবনতির পর সেদিন রাতেই ফের গণভবনে ডেকে পাঠানো হয় তাদের। এ বৈঠকে আনিসুল-কামাল, তিন বাহিনীর প্রধান, র্যাব ডিজি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবের পাশাপাশি শেখ রেহানাও ছিলেন। ডিজিএফআই-এসবিপ্রধান বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন। সেই বৈঠকেই নেওয়া হয় ৫ আগস্ট আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা। পুলিশ ও সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
রাতের আঁধারে গণভবনে হওয়া ওই বৈঠক শেষে সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে যান তিনি (চৌধুরী মামুন)। সেখানে ঢাকা শহরের প্রবেশমুখে ফোর্স মোতায়েন করে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মিটিং শেষে রাত সাড়ে ১২টায় তিনি চলে আসেন। ৫ আগস্ট সকালে যথারীতি পুলিশ সদর দপ্তরে যান তিনি। এর মধ্যে উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে ঢাকায় ঢুকতে শুরু করে ছাত্র-জনতার ঢল। দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে শেখ হাসিনা আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন না বলে জানতে পারেন তিনি। তবে ক্ষমতা ছাড়ার পর তিনি কোথায় যাবেন, সে বিষয়ে তখনও কিছু জানতেন না বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মামুন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক বর্তমান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও। তিনি গোটা জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরেন। এমনকি কী কারণে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন আগে আনা হয়, সেই বিবরণও দেন আদালতের কাছে। এছাড়া নিজের গুম হওয়ার ঘটনাও সামনে আনেন।
২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া অবশিষ্ট জবানবন্দিতে নাহিদ বলেন, অন্যান্য সমন্বয়ক ও ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বামপন্থি কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট শাহবাগে অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে কর্মসূচি ভণ্ডুল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে আন্দোলনের সমন্বয়কদের হত্যা বা গুম করা হতে পারে—এমন তথ্য পাওয়ার পর কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘মার্চ টু ঢাকা’ সফল করতে সমন্বয়কদের পক্ষে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন মাহফুজ আলম। একইসঙ্গে সম্ভাব্য নতুন সরকার গঠনের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনা করি। তাকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৫ আগস্ট ভোর থেকেই ঢাকায় আসতে থাকেন সারাদেশের মানুষ। ওই দিন সকালে শহীদ মিনার ও চানখারপুল এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শাহবাগেও কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে সড়ক ছেড়ে দেয় সেনাবাহিনী।

এরপর ঢাকার এই প্রাণকেন্দ্র পরিণত হয় জনসমুদ্রে। এর মধ্যেই খবর আসে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করছেন লাখো মানুষ। ঠিক তখনই শাহবাগ থেকে গণভবনের উদ্দেশ্যে মিছিল নিয়ে রওনা দেন ছাত্র-জনতা। আর এ গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে গণভবন ছাড়েন শেখ হাসিনা। সঙ্গে ছিলেন তার বোন শেখ রেহানাও। দুই বোন মিলে উড়াল দেন ভারতে। এরপরই দেশজুড়ে বিজয় উল্লাসে মাতেন কোটি মানুষ। দখলে নেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান বানচালের আঁতুড়ঘর গণভবনও।
জুলাই গণঅভুত্থানে সংঘটিত এসব ঘটনা ঘিরেই পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় আসে শেখ হাসিনার মামলায়। ওই রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী হওয়ায় পাঁচ বছরের সাজা পান সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। বর্তমানে মামুন কারাগারে থাকলেও শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক।
এখন পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন, প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ ও বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দিতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের ঘটনাপ্রবাহের নানা দিক সামনে এসেছে। এসব তথ্যে আন্দোলন দমনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের তৎপরতা, বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত এবং ৪ ও ৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। একইসঙ্গে আন্দোলনের নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিজেদের কৌশল বদলেছিল কিংবা শেষ পর্যন্ত রাজপথে কীভাবে জনস্রোত তৈরি হয়েছিল—সেসবও উঠে এসেছে বিভিন্ন তারকা সাক্ষীর জবানবন্দিতে। সবমিলিয়ে ৪ আগস্ট গণভবনে আন্দোলন ঠেকাতে শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনা চললেও পরদিন জনজোয়ারে ভেঙে পড়ে শেখ হাসিনার সরকারের শাসনামল।
সূত্র ঢাকা পোস্ট
জা ই/ এনজি






