নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ অক্টোবর, ২০২৬
ছয় দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমী আগামীকাল সোমবার সারাদেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হবে।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পূজার সময়সূচি অনুযায়ী, সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটের মধ্যে মহাষ্টমীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে এবং সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৮টা ৪৩ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে সন্ধিপূজা। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এই আচারটি সেই মুহূর্তটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন দেবী দুর্গা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুরকে বধ করার জন্য চামুণ্ডা রূপ ধারণ করেছিলেন।
ঐতিহ্য মেনে বিভিন্ন মন্দিরে অনুষ্ঠিত হবে কুমারী পূজা যেখানে দেবী দুর্গাকে ‘কুমারী’ বা পবিত্র হৃদয়ের এক কুমারী বালিকার রূপে পূজা করা হয়। রাজধানীতে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
এই আচারের সময় সাধারণত এক থেকে ১৬ বছর বয়সী, বয়ঃসন্ধি-পূর্ব এক অবিবাহিত বালিকাকে দেবী দুর্গা তথা দিব্য নারীশক্তির জীবন্ত রূপ হিসেবে পূজা করা হয়। এ সময় ভক্তরা কুমারীর চরণে জল, বস্ত্র, ফুল এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য অলঙ্কার নিবেদন করেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আজ রোববারও ছিল মহাসপ্তমী। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বছর শনি ও রোববার এই দুই দিন জুড়ে ‘মহা সপ্তমী’ তিথি থাকায় এ বছর দুইদিনব্যাপী মহা সপ্তমী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাজধানীসহ সারাদেশে হিন্দু-ধর্মাবলম্বীরা পূজামণ্ডপগুলোতে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় পূজা-অর্চণার মাধ্যমে দুইদিন ব্যাপী মহাসপ্তমী উদযাপন করে। দূর্গাভক্তরা দেবীর আরাধনায় পূজামণ্ডপগুলোতে দিনভর ভিড় জমায়।
সপ্তমীর সকালে শনিবার পূজার শুরুতেই দেবী দূর্গার প্রতিবিম্ব আয়নায় ফেলে বিশেষ ধর্মীয় রীতিতে স্নান করানো হয়। এরপর করা হয় নবপত্রিকা স্থাপন। নবপত্রিকার আরেক নাম হলো কলা বৌ স্নান। এছাড়া দেবীর চক্ষুদানের মাধ্যমে দেবী দূর্গার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পূজা শেষে হাতের মুঠোয় ফুল, বেলপাতা নিয়ে ভক্তরা মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এবারের পূজার প্রথম অঞ্জলি দেন দেবীর পায়ে। করজোরে কাতর কণ্ঠে জগজ্জননীর কাছে নিজের শাস্তি কামনায় প্রার্থনা করেন ভক্তরা। ঢাকের বাদ্য, কাসর ঘন্টা কিংবা শঙ্খধ্বনিতে দেবীর আরাধনার পাশাপাশি সব কিছুতেই যেনো ছিলো একই আর্তি।
মহাষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে শুক্রবার শুরু হয় সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব। বিজয়া দশমীতে দেবী বিসর্জনের মধ্যদিয়ে আগামী ২১ অক্টোবর দূর্গোৎসব শেষ হবে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ি, গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১ তে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আগমন করবেন। অন্যদিকে, দেবী নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে গমন করবেন।
এবছরও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দূর্গা পুজা উদযাপনের জন্য রাজধানীসহ সারাদেশে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। পূজামন্ডপগুলোতে আনসার, পুলিশ ও র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মন্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গণে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার এ বছর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সাথে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বাসস’কে বলেন, ‘এটি সত্যিই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’
দুর্গাপূজা কেবল একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও উদযাপিত হয়।
এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্যান্য ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে, যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকেই তুলে ধরে।
ফা আ/ এনজি






