রাত ১০:০৭ | বৃহস্পতিবার | ১১ জুন, ২০২৬ | ২৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩, গ্রীষ্মকাল | ২৪ জিলহজ, ১৪৪৭

বিশাল বাজেট: অর্থ আসবে কোথা থেকে, খরচ হবে কোথায়?

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১১ জুন ২০২৬

দুই দশক পর আবারও জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বা বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। বাজেটে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

অর্থ আসবে যেখান থেকে
সরকারের রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে থাকছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস শুল্ক থেকেই এই অর্থের সিংহভাগ আসবে।

এছাড়া এনবিআরবহির্ভূত কর রাজস্ব থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা, ফি, লভ্যাংশ ও অন্যান্য উৎস থেকে করবহির্ভূত রাজস্ব হিসাবে আরও ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে রাজস্ব আয় দিয়েও পুরো বাজেটের ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হবে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি অর্থ যাচ্ছে কোথায়
ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয় পরিচালন খাতে। আগামী অর্থবছর পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও সংশ্লিষ্ট খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয়ে ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বরাবরের মতোই অন্যতম বড় খাত হিসেবে থাকছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কর্মসংস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ এ অর্থ থেকে বাস্তবায়ন করা হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। সড়ক, সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় হবে।

কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষক কার্ড, কৃষি ভর্তুকি এবং খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।

স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়নে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। পানিসম্পদ খাতে খাল খনন, নদী পুনরুদ্ধার এবং বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে এক লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বাজেটে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা, ৫-জি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ক্রীড়া উন্নয়নে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি ও স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণে ২০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতি, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ১০০ কোটি টাকার জলবায়ু তহবিল এবং ধর্মীয় খাতে ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা ও ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য এক হাজার ৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সবশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার সেই বাজেটের প্রায় ১৩ গুণ বড় বাজেট নিয়ে এবার সংসদে হাজির হয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

 

 

টি আই / এনজি