মে মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের চত্বর যখন জমে ওঠে, কাঁচা ঘাসের ওপর শক্ত পায়ে মিছিল করা পুলিশ সদস্যদের খাকি পোশাক বাতাসে দোল খায়, বীরত্বের গল্প আর অত্যাধুনিক অস্ত্রের ঝলমলে প্রদর্শনী চোখ-ধাঁধায়, তখন সাধারণের চোখে ‘পুলিশ সপ্তাহ’ এক রঙিন উৎসব মাত্র। কিন্তু দৃষ্টির আড়ালে এই আয়োজনটি একটি জাতির নিরাপত্তাবেষ্টনীর মূলভিত্তি পুলিশ বাহিনীর আত্মপর্যালোচনার এক কঠিন দর্পণ। শুধু গান-বাজনা আর প্যারেডের ফানুস নয়, বরং জননিরাপত্তার সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ ও পেশাদারির মানদণ্ড মাপার দিন এটি।
শুধু আনুষ্ঠানিকতায় না থেকে এই সপ্তাহের সবচেয়ে বাস্তব দিক হলো পেশাদারির স্বীকৃতি।
১০ মে ২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহে সারা বছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সাহসী সদস্যদের বুকে তুলে দেওয়া হবে বিপিএম ও পিপিএম পদক। এ বছর মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা যেন এই পদকের আওতায় বেশি আসেন, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে, যা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোবল ও কর্মস্পৃহাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।
কিন্তু পুলিশ সপ্তাহ কেবল অতীতের ত্যাগের হিসাব নয়, এটি ভবিষ্যতের প্রস্তুতির কারখানা। এখানে নতুন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে উন্নত লজিস্টিক সাপোর্টের প্রদর্শনী হয়, যার মূল লক্ষ্য একটি ‘স্মার্ট পুলিশ’ গড়ে তোলা।
সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতি এই সময়টিকে সংস্কারের সুযোগ করে দেয়। পুলিশের দাবিদাওয়া, অপ্রচলিত আইনের সংস্কার এবং জনমুখী সেবার নকশা এ সময়ই চূড়ান্ত রূপ পায়।
পুলিশ সপ্তাহের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয় মাঠ পর্যায়ে। থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে এখনো যে অস্বস্তি ও দূরত্বের প্রাচীর অনুভূত হয়, তার প্রতিকার কামনা করেন সাধারন নাগরিকরা।
ব্যানার-ফেস্টুনের ভাষা ‘পুলিশ জনতা, জনতাই পুলিশ’ স্লোগান যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, পুলিশ সপ্তাহের প্রকৃত সার্থকতা সেখানেই।
এই লক্ষ্য পূরণে সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা সবচেয়ে জটিল। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পুলিশ যেন আইনের শাসন ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে, পুলিশ সপ্তাহ সেই বার্তাই দেয়। পুলিশ সপ্তাহের আলোচনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি জোরালো হওয়া উচিত, যেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের আস্থার সেতুটি আরো শক্ত হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাস গৌরব ও আত্মত্যাগে উজ্জ্বল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে রাজারবাগের পুলিশ লাইনস থেকে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান পুলিশের সদস্যরা অত্যাধুনিক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বাতিল ৩০৩ রাইফেল হাতে সেই প্রতিরোধের বুলেটগুলোই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্ত্রের ঠিকানা। মহান মুক্তিযুদ্ধে ডিআইজি থেকে শুরু করে কনস্টেবল—প্রায় প্রতিটি স্তরের পুলিশ সদস্য জীবন দিয়ে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে অমর করেছেন।
৫৫ বছর পেরিয়ে সেই একই রাজারবাগ প্রাঙ্গণ আজও দাঁড়িয়ে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেরও সাক্ষী এই রাজারবাগ। সেই গণ-অভ্যুত্থান যখন স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পথ তৈরি করে, সেই সংগ্রামে পুলিশ বাহিনীর একাংশ শহীদ ও আহত হয়েছে। সেদিনের সেই ত্যাগ আজ বাহিনীকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর প্রেরণা।
পুলিশ সপ্তাহ কেবল উৎসব ও গতানুগতিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে তা আয়োজকদের ব্যর্থতা।
সময়ের চ্যালেঞ্জ হলো সাইবার অপরাধ ও আধুনিক অপরাধের ধরন মোকাবেলায় পুলিশ বাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন। এর আগে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পুলিশ প্রায়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতো, যা বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। নতুন সূচনায় পুলিশ সপ্তাহ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী গড়ার ঘোষণা দেয়, তবেই এটি সার্থক।
সমাপনী অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে সরকারপ্রধান হয়তো বলবেন, ‘এই পুলিশ সপ্তাহ যেন নতুন বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।’ আর সেই কথাই কাম্য। কেবল বীরের সংবর্ধনা আর অস্ত্রের ঝলক দেখিয়ে নয়, বরং ভাঙা ভরসা ফিরিয়ে দিয়ে পুলিশ সপ্তাহের অন্তরাত্মা যেন ফিরে পায় সেই ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’-এর চিরায়ত আবেগ।
পুলিশ সপ্তাহের শেষে প্রতিটি থানা সত্যি যেন জনতার বন্ধুতে পরিণত হয়।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী