রাত ৮:৫১ | সোমবার | ২ নভেম্বর, ২০২৬ | ১৭ কার্তিক, ১৪৩৩, হেমন্তকাল | ২১ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮

গ্যাসসংকট সামলাতে চাপে বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদন

 

মোঃ আল রশিদ

৩১ আগস্ট ২০২৬

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ সাত মাস ধরে বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সর্বশেষ চালান দেওয়ার পর মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে সরবরাহ বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ফোর্স মেজর ঘোষণা করে সরবরাহ স্থগিতের মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়েছে, যার সর্বশেষ মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত।

এতে দেশের চলমান প্রাকৃতিক গ্যাসসংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন খাতে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোবাংলা।

পেট্রোবাংলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত সপ্তাহে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, এক্সিলারেট এনার্জি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বাংলাদেশে সর্বশেষ এলএনজি সরবরাহ করে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে কোম্পানিটি ফোর্স মেজর ঘোষণা করে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের জন্য এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি রয়েছে পেট্রোবাংলার। ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর বাংলাদেশ অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড মিনারেল করপোরেশন—পেট্রোবাংলা—ও এক্সিলারেট এনার্জির মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে পরবর্তী ১৫ বছর বাংলাদেশকে বছরে ৮ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করার কথা কোম্পানিটির। ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বছরে ৮ লাখ ৫০ হাজার টন করে এবং ২০২৮ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত বছরে ১০ লাখ টন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

পেট্রোবাংলার ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ সরবরাহের পরিমাণ ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বছরে ১২টি এবং ২০২৮ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত বছরে ১৬টি এলএনজি কার্গোর সমপরিমাণ। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ বন্ধ থাকায় চুক্তির আওতায় নির্ধারিত গ্যাস পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চুক্তিতে এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে তিন মাসের গড় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামের ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশের সঙ্গে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) জন্য শূন্য দশমিক ৩০ মার্কিন ডলার নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম যোগ করে।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালের আগস্টে প্রথম এলএনজি আমদানি শুরু করে। বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কিনছে সরকার। ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা পূরণে এসব উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আমদানি শুরুর পর ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ৬৩১টি কার্গোর মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৯১ লাখ ৩৩ হাজার টন এলএনজি আমদানি করেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশে মোট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ২৫২ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি থেকে এসেছে দৈনিক ৯৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট।

অন্যদিকে, ২০২৪ সাল থেকে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুটে রয়েছে। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান বিদ্যমান। এ ঘাটতি সামাল দিতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত রাখছে পেট্রোবাংলা।

এলএনজি সরবরাহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো, স্পট মার্কেট থেকে কার্গো সংগ্রহ এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে বিকল্প উৎস থেকে কতটা দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে, তা আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, কার্গোর প্রাপ্যতা এবং আমদানির আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

ফোর্স মেজর পরিস্থিতির অবসান এবং এক্সিলারেট এনার্জির সরবরাহ পুনরায় শুরুর সময় নির্ধারিত না হওয়ায় বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।

 

 

 

আ র / এনজি