রাত ৩:০৮ | শনিবার | ১৮ জুলাই, ২০২৬ | ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩, বর্ষাকাল | ৩ সফর, ১৪৪৮

এই স্পেন যেসব কারণে ভয়ঙ্কর

স্পোর্টস ডেস্ক

চার বছর আগে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের মহাকাব্য লিখেছিল আর্জেন্টিনা। এবার আলবিসেলেস্তেদের সামনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ইতালি ও ব্রাজিলের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার কীর্তি গড়ার সুযোগ। দলে আছেন লিওনেল মেসির মতো তারকা ফুটবলার। যিনি ৩৯ বছর বয়সেও দলের প্রাণভোমরা হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন। তবে ইতিহাস গড়ার এই শেষ ধাপে এসেও ফাইনালে ফেভারিট হিসেবে নামছে না আর্জেন্টিনা।

কেন ফাইনালে ফেভারিট স্পেন?

কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে আর ব্র্যাডলি বারকোলাদের নিয়ে গড়া তারকাবহুল ফ্রান্সকে অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছিল এবারের টুর্নামেন্টজুড়ে। সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষেও পরিস্কার ফেভারিট ছিল তারা। কিন্তু ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ফরাসিদের কোনো রকম দাঁড়াতেই দেয়নি স্পেন। ২-০ গোলের দাপুটে জয়ে তারা ফাইনালে পা রাখে।

অথচ টুর্নামেন্টের শুরুটা খুব একটা ভালো ছিল না লা রোজাদের। নবাগত কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করার পর উরুগুয়ে, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষেও খুব একটা শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে পারেনি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। তবে সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও চেনা ছন্দ ফিরে পেয়েছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

লা ফুয়েন্তের ‘ঐক্যবদ্ধ’ স্পেনই বড় শক্তি

স্পেনের ঠিক কোন শক্তির জায়গাগুলো আর্জেন্টিনার জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে বরং তাদের দুর্বলতা কোথায়, সেটি খোঁজাই বোধ হয় বেশি সহজ! সত্যি বলতে, স্প্যানিশ দলটির খুব বেশি দুর্বলতা চোখে পড়ে না। আর ঠিক এ কারণেই সেমিফাইনালের আগপর্যন্ত তাদের নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স সবাইকে এতটা অবাক করেছিল।

এ বিষয়ে দে লা ফুয়েন্তের সোজা উত্তর ছিল, ‘আমার কাছে সেরা দল বলতে একটিই আছে—আর সেটি হলো স্পেনের জাতীয় দল।’ তিনি আরও বলেন, ‘খেলোয়াড়েরা কোন ক্লাব বা প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছে, সেটি আমি দেখি না। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সব স্প্যানিশ খেলোয়াড়, যারা নিজেদের দেশের জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির অংশ হতে পেরে গর্ববোধ করে।’

সেমিফাইনালে স্পেনের শুরুর একাদশের মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায় তাদের শক্তির গভীরতা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী পিএসজির মাঝমাঠের মূল ভরসা ফাবিয়ান রুইজ খেলছেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকায়। উইংয়ের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন আলেক্স বায়েনা। আর মাঝমাঠের আসল ক্রাফটসম্যান বা ম্যাস্ট্রো হলেন ম্যানচেস্টার সিটির ২০২৪ ব্যালন ডি’অর বিজয়ী তারকা রদ্রি।

আক্রমণভাগে স্পেনের একমাত্র স্ট্রাইকার মিকেল ওইয়ারসাবাল তো তার পারফরম্যান্স দিয়ে রিয়াল সোসিয়েদাদকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে চেনাচ্ছেন। ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড চলতি টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে পাঁচ গোল করে ফেলেছেন। রোববার স্পেনের হাতে ট্রফি উঠলে স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে তার নাম নিশ্চিতভাবেই কিংবদন্তির তালিকায় লেখা থাকবে।

ক্লাব ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে স্প্যানিশ জাতীয় দলেও এখন মূল চালিকাশক্তি বার্সেলোনার একঝাঁক তারকা। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে এবারের বিশ্বকাপে খুব বেশি আলো ছড়াতে না পারলেও, লামিনে ইয়ামালই এখন বিশ্ব ফুটবলের নতুন পোস্টার বয়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপের পাশাপাশি এই ১৯ বছর বয়সী তরুণকেই ধরা হচ্ছে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরি। ২০২৪ ইউরো কাপে স্পেনের শিরোপাজয়ের নায়ক ইয়ামালের জাদুর অপেক্ষায় বুঁদ হয়ে আছেন কোটি ভক্ত।

মাঝমাঠে আক্রমণ গড়ার মূল কারিগর হিসেবে আছেন দানি ওলমো। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের ঠিক সামনে পজিশন নিয়ে দুই উইঙ্গার ও মূল স্ট্রাইকারকে নিখুঁত পাস জোগানোই তার কাজ। আর রক্ষণভাগের হৃদপিণ্ড হয়ে উঠেছেন বার্সেলোনার মাত্র ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি, যিনি ইতোমধ্যে ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই জায়গাতেই নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন।

স্পেনের বেঞ্চ কতটা শক্তিশালী, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সম্ভবত অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের ২৪ বছর বয়সী তারকা উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস। ২০২৪ ইউরো জয়ের পেছনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও এই বিশ্বকাপে বর্তমান দলটিতে শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়াই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

কেমন ফাইনাল হতে যাচ্ছে?

টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ের মতো কি স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালটিও মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে? খুব পাড় আর্জেন্টাইন সমর্থক ছাড়া এভাবে ভাবা একটু কঠিনই হবে। শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে জেতার পর, সেমিফাইনালে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও একই ঢঙয়ে জিতেছে লিওনেল স্কালোনির দল।

রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ আর আর্সেনালের মতো বিশ্বসেরা ক্লাবের তারকাদের নিয়ে গড়া ইংল্যান্ড দল সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথমার্ধে এগিয়েই ছিল। এমনকি বার্সেলোনার নতুন ইংলিশ রিক্রুট অ্যান্থনি গর্ডনের ৫৫ মিনিটের গোলে তারা লিডও নেয়। কিন্তু এরপরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আর্জেন্টিনার হাতে, যার বড় কারণ ছিল লিড পাওয়ার পর রক্ষণাত্মক হয়ে ওঠার ইংলিশ মানসিকতা। ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনা রেকর্ড ৬৪ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ম্যাচ জিতে নেয়।

ইংল্যান্ড দল প্রথাগতভাবে বল পজিশন ধরে রেখে খেলার জন্য খুব একটা সুপরিচিত নয়, কিন্তু স্পেনের ফুটবল দর্শনই এটি। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল ফাইনালে শুরু থেকেই মাঝমাঠের দখল নেওয়ার চেষ্টা করবে এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে লিওনেল মেসির আক্রমণাত্মক ধারকে ‘ভোঁতা’ করার পরিকল্পনা করবে।

ফাইনালে স্পেনের মিডফিল্ড জেনারেল রদ্রি এবং ফাবিয়ান রুইজকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে, লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো এবং আলেক্স বায়েনাদের প্রধান কাজই হবে স্ট্রাইকার মিকেল ওইয়ারসাবালকে অনবরত বলের জোগান দেওয়া। আর ম্যাচের কোনো পর্যায়ে আর্জেন্টিনা যদি অল-আউট ফুটবল খেলে (যেমনটা তারা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিল), তবে গতিময় প্রতি-আক্রমণে (কাউন্টার অ্যাটাক) আলবিসেলেস্তেদের রক্ষণ ভেঙে ফেলার চেষ্টায় থাকবে স্প্যানিশ উইঙ্গাররা।

তবে সব হিসাব ভেঙে চুরমার করে দিতে পারেন এক লিওনেল মেসি। প্রায় দুই দশক ধরে বার্সেলোনা ও বিশ্ব ফুটবল শাসন করা মেসি আসন্ন ফাইনালেও আর্জেন্টিনার তুরুপের তাস। ৩৯ বছর বয়সেও এই বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে ৮টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে আছেন তিনি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা যখন পিছিয়ে ছিল, তখন মেসির জাদুকরী দুটি অ্যাসিস্টেই ঘুরে দাঁড়ায় স্কালোনির দল। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আলবিসেলেস্তেদের বড় ভরসাও তারও ওপর।

কা হি / এনজি